মনজিলা ঝুমা
মনজিলা ঝুমা

বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর): বিচারপ্রাপ্তির সহজ পথ ও মামলা জট নিরসনের কার্যকর কৌশল

মনজিলা সুলতানা ঝুমা : বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার অন্যতম বড় সংকট হলো দীর্ঘদিন ধরে চলমান মামলা জট। বিচারপ্রার্থীদের একটি বড় অংশ বছরের পর বছর আদালতের দ্বারস্থ থেকেও কাঙ্ক্ষিত বিচার পান না। ফলে ন্যায়বিচার যেমন বিলম্বিত হয়, তেমনি বিচারব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাও ক্ষুণ্ন হয়। বিচারশাস্ত্রের সুপরিচিত নীতি “Justice delayed is justice denied” বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত।

দেশের আদালতগুলোতে আজ লক্ষাধিক নয়, বরং কয়েক মিলিয়ন মামলা বিচারাধীন। বিচারকের সংখ্যা, অবকাঠামো এবং প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়ানো হলেও কেবল প্রচলিত বিচারব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে এই জট নিরসন করা সম্ভব নয়। তাই সময়ের প্রয়োজন এমন একটি কার্যকর ব্যবস্থা, যা দ্রুত, কম ব্যয়ে এবং পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে বিরোধ নিষ্পত্তি করতে সক্ষম। সেই ব্যবস্থার নামই বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (Alternative Dispute Resolution—ADR)।

বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) কী?

বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি এমন একটি আইনসম্মত প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে আদালতের বাইরে অথবা আদালতের তত্ত্বাবধানে বিরোধে জড়িত পক্ষগুলো পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছায়। মধ্যস্থতা (Mediation), সালিশ (Arbitration), সমঝোতা (Conciliation) এবং আলোচনার (Negotiation) মাধ্যমে পরিচালিত এই ব্যবস্থা আধুনিক বিচারব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত।

এর মূল দর্শন হলো—বিরোধকে সংঘাতে পরিণত না করে সংলাপ, পারস্পরিক সম্মান এবং ন্যায্য সমঝোতার মাধ্যমে সমাধান করা। ফলে এক পক্ষের জয় ও অন্য পক্ষের পরাজয়ের পরিবর্তে উভয় পক্ষের জন্য গ্রহণযোগ্য একটি সমাধান তৈরি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষা করতেও সহায়ক।

সাংবিধানিক চেতনা ও এডিআর

বাংলাদেশের সংবিধানে “বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি” শব্দটি সরাসরি উল্লেখ না থাকলেও এর মৌলিক দর্শন সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদে প্রতিফলিত হয়েছে:

  • অনুচ্ছেদ ২৭: আইনের দৃষ্টিতে সকল নাগরিকের সমতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে।

  • অনুচ্ছেদ ৩১: প্রত্যেক নাগরিকের আইনের আশ্রয় লাভ এবং আইনানুগ আচরণ পাওয়ার অধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

  • অনুচ্ছেদ ৩৫: যথাযথ আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ ব্যতীত কাউকে দণ্ডিত না করার নীতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

এসব সাংবিধানিক বিধান বিচারপ্রাপ্তিকে কেবল আদালতের আনুষ্ঠানিক রায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে না; বরং কার্যকর, সহজলভ্য এবং সময়োপযোগী বিচার নিশ্চিত করার দায়িত্বও রাষ্ট্রের ওপর অর্পণ করে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে এডিআর সংবিধানের ন্যায়বিচার ও আইনের শাসনের চেতনার সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ।

বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনি কাঠামো ও এডিআরের ভিত্তি

বাংলাদেশে সব ধরনের এডিআরকে সমন্বিতভাবে নিয়ন্ত্রণকারী একটি একক ও পূর্ণাঙ্গ আইন এখনো প্রণীত না হলেও, বিদ্যমান আইনগুলোতে এর একটি শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে উঠেছে:

  • দেওয়ানি কার্যবিধি (১৯০৮): এই আইনের ধারা ৮৯ক, ৮৯খ ও ৮৯গ-এর মাধ্যমে দেওয়ানি মামলায় মধ্যস্থতার বিধান যুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে অর্ডার X (বিধি ১ক থেকে ১গ)-এ আদালতকে বিচারপ্রক্রিয়ার প্রাথমিক পর্যায়েই (স্বীকারোক্তি বা অস্বীকার রেকর্ড করার পর) বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির সম্ভাবনা বিবেচনার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এডিআর সফল হলে সে অনুযায়ী বিরোধ নিষ্পত্তি হয়, আর ব্যর্থ হলে মামলা পুনরায় আদালতে ফিরে আসে।

  • সালিসি আইন (২০০১): এটি বাংলাদেশে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য একটি আধুনিক আইনগত কাঠামো গড়ে তুলেছে।

  • গ্রাম আদালত আইন (২০০৬): গ্রামীণ জনগণের জন্য ক্ষুদ্র দেওয়ানি ও কিছু নির্ধারিত ফৌজদারি বিরোধ দ্রুত এবং স্বল্প ব্যয়ে নিষ্পত্তির সুযোগ সৃষ্টি করেছে।

  • পারিবারিক আদালত আইন (২০২৩): পারিবারিক বিরোধে আপস-মীমাংসা ও পুনর্মিলনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে, যাতে বিচারিক প্রক্রিয়ার পাশাপাশি পারিবারিক সম্পর্কও অক্ষুণ্ন থাকে।

এডিআরের প্রয়োজনীয়তা ও সামাজিক গুরুত্ব

আদালতে একটি দেওয়ানি মামলা নিষ্পত্তি হতে প্রায়ই বহু বছর লেগে যায়। দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ায় বিচারপ্রার্থীকে কোর্ট ফি, আইনজীবীর সম্মানী, যাতায়াত ব্যয় এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক খাতে উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে মামলার ব্যয়ই বিরোধের আর্থিক মূল্যের চেয়ে বেশি হয়ে দাঁড়ায়। অথচ এডিআরের মাধ্যমে একই বিরোধ তুলনামূলক কম সময়ে এবং অনেক কম ব্যয়ে নিষ্পত্তি করা সম্ভব।

আদালতের রায়ে সাধারণত একজন বিজয়ী এবং অন্যজন পরাজিত হন, যার ফলে পারিবারিক বা সামাজিক সম্পর্ক স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কিন্তু মধ্যস্থতা বা সমঝোতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি হলে উভয় পক্ষের সম্মতিতেই সমাধান হয়। ফলে সম্পর্কের অবনতি না ঘটিয়ে পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতার পরিবেশ বজায় থাকে। বিশেষ করে পারিবারিক বিরোধ, ব্যবসায়িক অংশীদারিত্ব, প্রতিবেশী বিরোধ, ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধ এবং ক্ষুদ্র দেওয়ানি বিরোধের ক্ষেত্রে এডিআর অত্যন্ত কার্যকর।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও এডিআরের সীমাবদ্ধতা

বিশ্বের উন্নত দেশ যেমন—যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং সিঙ্গাপুরের মতো দেশে আদালতে মামলা গ্রহণের আগেই অনেক ক্ষেত্রে মধ্যস্থতার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক বিরোধের ক্ষেত্রেও সালিশ এখন সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি।

তবে এটিও মনে রাখা জরুরি যে, এডিআর সব ধরনের বিরোধের জন্য প্রযোজ্য নয়। হত্যা, ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতন, মানবপাচার, সন্ত্রাসবাদ কিংবা রাষ্ট্রবিরোধী অপরাধের মতো গুরুতর ফৌজদারি মামলায় বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির কোনো সুযোগ নেই। এসব অপরাধে রাষ্ট্রের নিয়মিত বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক।

উত্তরণের উপায় ও করণীয় পদক্ষেপ

বাংলাদেশে প্রশিক্ষিত মধ্যস্থতাকারীর অভাব, জনসচেতনতার ঘাটতি এবং সমন্বিত নীতিমালার অভাবে এডিআরের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এডিআরকে বিচারনীতির কেন্দ্রস্থলে নিয়ে আসতে নিচের পদক্ষেপগুলো নেওয়া জরুরি:

১. একটি সমন্বিত ও পূর্ণাঙ্গ ‘জাতীয় এডিআর আইন’ প্রণয়ন করা।

২. দক্ষ মধ্যস্থতাকারী তৈরির জন্য নিয়মিত প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।

৩. বিচারক ও আইনজীবীদের এডিআর বিষয়ক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।

৪. প্রতিটি জেলায় আধুনিক ও সর্বজনীন ‘মধ্যস্থতা কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠা করা।

৫. সাধারণ মানুষের মধ্যে এডিআর সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন শিক্ষায় এটিকে আরও গুরুত্ব দিয়ে অন্তর্ভুক্ত করা।

শেষ কথা

ন্যায়বিচারের প্রকৃত অর্থ কেবল আদালতের রায় নয়; বরং এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে মানুষ দ্রুত, সহজে, কম ব্যয়ে এবং মর্যাদার সঙ্গে তার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারে। বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) সেই লক্ষ্য অর্জনের একটি কার্যকর ও সময়োপযোগী মাধ্যম।

আদালতের বিকল্প নয়, বরং বিচারব্যবস্থার একটি পরিপূরক ও শক্তিশালী সহযোগী ব্যবস্থা হিসেবে এডিআরকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে মামলা জট হ্রাস, বিচারপ্রার্থীর ভোগান্তি লাঘব এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করতে সক্ষম হবে।

লেখক: মনজিলা সুলতানা ঝুমা, আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।