সাঈদ আহসান খালিদ
সাঈদ আহসান খালিদ

দুগ্ধপোষ্য শিশুসহ কারাবাস: আইন, মানবিকতা ও বিচারিক দায়বদ্ধতা

সাঈদ আহসান খালিদ : সম্প্রতি ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক জুলাই আন্দোলনের প্রেক্ষিতে তেজগাঁও থানায় দায়ের করা বিস্ফোরক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের একটি মামলায় যুব মহিলা লীগের এক নেত্রীকে জামিন না দিয়ে তার দেড় মাস বয়সী দুগ্ধপোষ্য শিশুসহ কারাগারে প্রেরণের ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, শিশুটির জন্ম হয় মাত্র ৪৬ দিন আগে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে। প্রসূতি মা এখনো শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠতে পারেননি; এর মধ্যেই বাথরুমে পড়ে তার বাম হাত ভেঙে যায়। ফলে তিনি শিশুকে স্বাভাবিকভাবে কোলে নেওয়া বা এককভাবে দেখাশোনা করতেও অক্ষম।

শুনানির পূর্বে কোমরে সিজারিয়ান বেল্ট পরিহিত অবস্থায় আদালতের বারান্দায় তিনি শিশুকে দুধ পান করাচ্ছিলেন। এমন পরিস্থিতিতেই তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয়। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, শিশুটি কারাগারে বাঁচবে না, কারণ তিনি তাকে যথাযথভাবে যত্ন নিতে পারছেন না। তার আইনজীবী সাক্ষাৎকারে জানান, সমস্ত মানবিক বিবেচনার বিষয়ে আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও তা প্রত্যাখ্যাত হয়।

পরবর্তীতে জানা যায়, ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জামিনের আবেদন পুনর্বিবেচনা করে অভিযুক্ত নারীকে জামিন প্রদান করেছেন।

আরও পড়ুন : উকিলের পোশাকে বিচারক: নিজের স্বীকারোক্তিতেই ফাঁস হলো আইনের ফাঁক

কারাগারে প্রেরণের আদেশদানকারী বিচারক আমার স্নেহধন্য ও সরাসরি ছাত্র হওয়ায় ঘটনাটি আমাকে ব্যক্তিগতভাবেও গভীরভাবে ব্যথিত, হতাশ ও বিচলিত করেছে। আমার বিবেচনায়, এই ক্ষেত্রে বিচারক মানবিকতা, বিচারিক প্রজ্ঞা, Judicial Discretion এবং ক্রিমিনোলজিক্যাল দৃষ্টিভঙ্গি যথাযথভাবে প্রয়োগ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। শুধু তাই নয়, এই সিদ্ধান্ত দেশের বিদ্যমান আইন ও সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনার পরিপন্থী বলেও প্রতীয়মান হয়।

ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ৪৯৭(১) ধারায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে যে, অপরাধ অ-জামিনযোগ্য হলেও আদালত উপযুক্ত বিবেচনায় নারী, অসুস্থ বা দুর্বল ব্যক্তিকে জামিন প্রদান করতে পারেন। আলোচ্য ক্ষেত্রে অভিযুক্ত নারী এই বিবেচনার সকল মানদণ্ড পূরণ করেন।

বাংলাদেশের ফৌজদারি আইনে গর্ভবতী নারী ও নবজাতকের সুরক্ষায় সুস্পষ্ট মানবিক নীতিমালা বিদ্যমান। উদাহরণস্বরূপ, ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৮২ ধারা অনুযায়ী, কোনো গর্ভবতী নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর স্থগিত রাখা বাধ্যতামূলক, এবং প্রয়োজনে তা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে রূপান্তর করা যেতে পারে। এই বিধান যেখানে গর্ভস্থ শিশুর জীবনের সুরক্ষা নিশ্চিত করে, সেখানে সদ্যোজাত শিশুর ক্ষেত্রে—যার জীবন সম্পূর্ণরূপে মায়ের দুগ্ধ ও পরিচর্যার উপর নির্ভরশীল—মায়ের জামিন একটি শক্তিশালী আইনি ও মানবিক দাবিতে পরিণত হয়।

এক্ষেত্রে পাকিস্তানের Nusrat vs The State [1996 SCMR 973] মামলাটি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। উক্ত মামলায় আদালত পর্যবেক্ষণ করেন যে, মা অপরাধী হলেও তার দুগ্ধপোষ্য শিশু সম্পূর্ণ নিরপরাধ। ‘শিশুর কল্যাণ’ এবং ‘কারাবাস’—এই দুই ধারণা মৌলিকভাবে পরস্পরবিরোধী। সুতরাং মায়ের অপরাধের জন্য একটি নিরপরাধ শিশুকে কারাবন্দি রাখা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।

এই রায়ে মহানবী (সা.)-এর যুগের “গামিদিয়া (Ghamidiyyah)” নীতির উল্লেখ করা হয়, যেখানে এক গর্ভবতী নারীর সাজা কেবল সন্তান প্রসব পর্যন্ত নয়, বরং শিশুর দুগ্ধপানকাল (২ বছর) শেষ না হওয়া পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল শিশুর জীবন ও শারীরিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা। আদালত এটিকে ‘স্বর্ণালী নীতি’ হিসেবে অভিহিত করে এবং আধুনিক বিচারব্যবস্থায় এর প্রয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ করে।

বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতও বিভিন্ন রায়ে উল্লেখ করেছেন যে, কারাগারের পরিবেশ নবজাতক ও শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য অনুপযুক্ত। একজন মায়ের কারাবাস বাস্তবে একটি নিরপরাধ শিশুরও কারাবাসে পরিণত হয়। তাই শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থে অভিযুক্ত মায়ের জামিন প্রদান অপরিহার্য।

আরও পড়ুন : আইনজীবী হতে জীবিত থাকা জরুরি, বয়স কোনো ব্যাপার না!

২০২৩ সালে হবিগঞ্জ জেলা কারাগারে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এক মায়ের সঙ্গে ১০ মাস বয়সী শিশু মাহিদার অবস্থান নিয়ে হাইকোর্ট বিভাগ একটি তাৎপর্যপূর্ণ আদেশ প্রদান করেন। আদালত মন্তব্য করেন যে, কারাগারের পরিবেশ কোনোভাবেই শিশুর বিকাশের উপযোগী নয় এবং এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। একই সঙ্গে সারা দেশের ৬৮টি কারাগারে থাকা ৩০৪ জন শিশুর অবস্থা নিয়ে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

বাংলাদেশের শিশু আইন, ২০১৩-এর ৮৯(১)(ঙ) ধারা অনুযায়ী, কারাভোগরত মাতা-পিতার ওপর নির্ভরশীল বা কারাভোগরত মায়ের সঙ্গে অবস্থানরত শিশু ‘সুবিধাবঞ্চিত শিশু’ হিসেবে স্বীকৃত। এ ধরনের শিশুদের বিশেষ সুরক্ষা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের আইনগত দায়িত্ব (ধারা ৮৯(২))।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, প্রথমে জামিন প্রত্যাখ্যান করা হলেও পরবর্তীতে চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট একই মামলায় জামিন প্রদান করেছেন—যা প্রমাণ করে যে, আইনি কোনো প্রতিবন্ধকতা ছিল না। ফলে প্রাথমিক সিদ্ধান্তটি বিচারিক বিচক্ষণতার অভাব বা ত্রুটিপূর্ণ প্রয়োগের ইঙ্গিত বহন করে।

আরও উদ্বেগজনক হবে যদি এ ধরনের সিদ্ধান্ত কোনো ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক প্রভাবের ফল হয়ে থাকে। জুলাই-পরবর্তী সময়ে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে যে প্রত্যাশা ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, এই ধরনের ঘটনা তা ক্ষুণ্ণ করে। জনগণ বিচার বিভাগকে কোনো রাজনৈতিক শক্তির অনুগত প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখতে চায় না।

বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়ন বা প্রশাসনিক স্বাতন্ত্র্যের মাধ্যমে অর্জিত হয় না; বরং তা নিশ্চিত হয় বিচারকদের স্বাধীন বিবেক, নিরপেক্ষতা এবং ন্যায়বোধের সাহসী প্রয়োগের মাধ্যমে।

লেখক: শিক্ষক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।