শাহ্ মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান [প্রবন্ধটি অ্যাডভোকেট শাহ্ মোহাম্মদ কবীরকে উৎসর্গকৃত] :
অবিভক্ত ভারতের জাতীয়তাবাদী নেতা চিত্তরঞ্জন দাশ (১৮৭০-১৯২৫), যিনি সি. আর. দাশ নামে সমধিক পরিচিত এবং সাধারণ্যে ‘দেশবন্ধু’ বলে আখ্যায়িত। তিনি বিশ শতকের বাংলার সবচেয়ে প্রগতিশীল রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের অন্যতম। জানা যায়, তিনি বিলেতে যোগ্যতার সঙ্গে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় পাস করলেও, রাজনৈতিক বক্তৃতার জন্য পরে তাঁর নাম আইসিএস অফিসারের শিক্ষানবিশের তালিকা হতে বাদ দেওয়া হয়। তিনি সিভিল সার্ভিস হতে বঞ্চিত হন।
বিলেতে থাকাকালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ আইনের বই ব্যাপক অধ্যয়ন করেছেন। সভাসমিতিতে বক্তৃতা দিয়ে নিজের জ্ঞান-বুদ্ধির পরিচয় প্রদান করেছেন। আইন অধ্যয়নকালে চিত্তরঞ্জন ইংল্যান্ডের শ্রেষ্ঠ আইনজীবীদের দেখেছেন। আইসিএস দিয়ে তাঁর জজ-ম্যাজিস্ট্রেট হওয়ার পথ কণ্টকিত হলে তিনি সে পথ ছেড়ে অন্য পথে পা দিলেন। তাঁর আত্মীয়স্বজনেরা আশা করেছিলেন, সিভিল সার্ভিস পাস করে সংসারের কষ্ট দূর করবেন। কিন্তু আমরা বাহ্যিকভাবে না বুঝে অনেক সময় নিজের কল্পনায় যা ভালো মনে করেছি, বিধাতার বিধানে তা মন্দ হয়ে দাঁড়ায়। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ ব্যারিস্টারি পড়ায় মনোনিবেশ করলেন। ১৮৯৩ খ্রিষ্টাব্দে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তিনি দেশে ফিরলেন। দেশে এসে সেই বছরই তিনি কলকাতা হাইকোর্টে ব্যারিস্টারি করতে আরম্ভ করলেন। তিনি দেওয়ানি ও ফৌজদারি উভয় আইনে দক্ষ ছিলেন।
বিলেতে গেলে সচরাচর বাবুরা সাহেব সেজে দেশে ফেরেন। দেশি পোশাক-পরিচ্ছদ, আচার-ব্যবহার, দেশি ভাষা কিছুই তাঁদের ভালো লাগে না। তখন তাঁরা যেভাবেই হোক হ্যাট-কোট পরবেন, নেকটাই বাঁধবেন, বিলেতি ঢঙে চলবেন। নেটিভদের আর কোনোটাতেই মন উঠবে না। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের গায়েও তার একটু বাতাস লেগেছিল। প্রথম জীবনে কিছুদিন তিনি ঔপনিবেশিক কায়দায় মি. সি. আর. দাশই ছিলেন। কিন্তু তা হলেও অনেক বিষয়ে তাঁর আসল প্রকৃতি ফুটে উঠত। এদেশের সাহিত্য-সেবায়, দরিদ্র-সেবায়, স্বজন-সেবায় তাঁর স্বরূপ প্রকাশ হতো।
১৮৯৮ সালে শ্রীমতী বাসন্তী দেবীর সাথে তাঁর শুভ বিবাহ হয়। বাসন্তী দেবী একজন আদর্শ-চরিত্রা রমণী ছিলেন। সমকালে কলকাতা হাইকোর্টে ব্যারিস্টারিতে ভয়ানক প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতার মধ্যে কোনো উকিল-ব্যারিস্টারের সহজে পসার হয়ে উঠতে পারে না। যাদের সহযোগিতায় পারিবারিক আত্মীয়স্বজন ও মুরব্বি থাকে, তাদের কথা আলাদা স্বতন্ত্র; কিন্তু মুরব্বিহীনের পক্ষে আইন ব্যবসায় উন্নতি লাভ করা বড়ই কষ্টকর। প্রথম প্রথম তিনি মফস্বলের নিম্ন আদালতে মোকদ্দমার ভার নিয়ে মফস্বলে যেতেন। সেই সময় তিনি নিবিষ্ট মনে আইন অধ্যয়ন করতেন। ‘পরীক্ষা পাস করে কেউ কিছু শিখতে পারে না’—এটি তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল। কাজেই ভারতীয় প্রাচীন ঋষি-যোগীর যোগ সাধনের ন্যায় তিনি আইন পুস্তকগুলো পাঠ করতে লাগলেন। ব্যারিস্টারির প্রথম জীবনে তিনি যে কঠোর পরিশ্রম করেছিলেন, তা আজও শিক্ষার্থী মাত্রেরই শিক্ষণীয়।
পরিশ্রম কখনো নিষ্ফল হয় না। তাঁর অসাধারণ প্রতিভা ছিল। এই অসাধারণ প্রতিভা ও কঠোর পরিশ্রম পরস্পর মিলিত হয়ে তাঁর উন্নতির পথ সুগম করে দিল। অবশেষে তাঁর প্রতিভা-বিকাশের এক মাহেন্দ্রক্ষণ উপস্থিত হলো। অমাবস্যা কেটে শুক্লা প্রতিপদ দেখা দিল। যখন লর্ড কার্জন ভারতের রাজপ্রতিনিধি, তখন বঙ্গভঙ্গের ব্যবস্থা হয়েছিল। সেই বঙ্গ-বিচ্ছেদের ফলে দেশে এক মহা আন্দোলন উপস্থিত। চারিদিকে হৈচৈ পড়ে যায়। এই সময়ই আলিপুরের বোমার মামলা উপস্থিত হয়; কলকাতায় এক ভীষণ ষড়যন্ত্রের ব্যাপার প্রকাশ হয়ে পড়ে। কানাইলাল, ক্ষুদিরাম, বারীন্দ্র, উপেন্দ্রসহ অনেক যুবক ওই বোমার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট বলে অভিযুক্ত হলো। বিপ্লবী অরবিন্দ ঘোষও এই ঘটনায় দোষী আছেন বলে আইনের বেড়াজালে পড়লেন। ১৯০৯ সালের আলিপুরের বোমার মামলা সমকালে একটা সর্বজনবিদিত আলোচিত ঘটনা। রাজবিদ্রোহের ষড়যন্ত্র, গুরুতর ঘটনা, ভীষণ ব্যাপার উপস্থিত। সমস্যা দাঁড়াল—এই মামলায় আসামির পক্ষ সমর্থন করবেন কে? সরকার পক্ষে বড় বড় ব্যারিস্টার—এই মোকদ্দমা লড়তে সাহস করবেন। আসামির পক্ষে লড়তে যোগ্যতা লাগবে, সঙ্গে সঙ্গে ত্যাগ স্বীকারও করতে হবে। দুই-চার দিন মোকদ্দমা চলবে না, চলবে অনেক দিন। হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে মোকদ্দমা চালাতে হবে, কিন্তু পরিশ্রম যে পরিমাণ, টাকা সে পরিমাণ মিলবে না।
বিপ্লবী অরবিন্দ বুঝতে পারলেন, এই বিষয়ে একমাত্র যোগ্যতম ব্যক্তি দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ। তিনি ভিন্ন আর কারো দ্বারা এ কার্য সম্পন্ন হবে না। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ বিপ্লবী অরবিন্দের পক্ষে দাঁড়ালেন। গভর্নমেন্ট পক্ষে দাঁড়ালেন ইংরেজ ব্যারিস্টার মি. নর্টন। দীর্ঘ আট মাস ধরে মোকদ্দমা চলল। অনেক জেরা, জবানবন্দি ও নানা প্রকার তর্কবিতর্ক চলতে লাগল। সকলেই আগ্রহ সহকারে উভয় ব্যারিস্টারের বাগ্বিতণ্ডা ও তর্ক-বিতর্ক শুনতে লাগল। মামলার শেষ তারিখে আদালতগৃহ লোকে পরিপূর্ণ হয়ে গেল। সকলেরই আগ্রহ চিত্তরঞ্জনের বক্তৃতা শুনবে। সেদিন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ যে বক্তৃতা করেছিলেন, তা অনির্বচনীয়। যেমন ওজস্বিনী ভাষা, তেমন প্রাণস্পর্শী ভাব। ভাষার এমন মধুরতা, এমন উন্মাদনা—যিনি শুনেছেন, তিনিই বিমুগ্ধ হয়ে গেছেন। বিচারপতি একমনে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের বক্তৃতা শুনলেন। শুনে তিনি অশ্রু ধরে রাখতে পারলেন না।
সেদিনের সেই মর্মস্পর্শী বক্তৃতা শুনে আদালত ঘরে যত উকিল, ব্যারিস্টার ও অপর শ্রোতা উপস্থিত ছিলেন, সকলেই চোখের জল ফেলতে লাগলেন। অবশেষে রায় প্রকাশ হলো। বিপ্লবী অরবিন্দ নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে বেকসুর খালাস পেলেন। সত্যের জয় না হয়ে পারে না। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ উৎফুল্ল হয়ে বিপ্লবী অরবিন্দের হাত ধরে আদালত কক্ষ হতে বের হলেন। চারিদিকে জয়ধ্বনি হতে লাগল। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের পরিশ্রম সার্থক হলো। তাঁর ত্যাগ, একনিষ্ঠতা ও যোগ্যতার কথা কারো বুঝবার বাকি থাকল না। এই ঘটনায় তিনি একদিকে ক্ষতিগ্রস্ত, আর একদিকে মহালাভবান হয়েছিলেন। এই লোকসানে লাভের বীজ অঙ্কুরিত হলো। এই মামলার পরেই দেশ-দেশান্তরে তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ল। সমকালে সবার মুখেই দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের নাম। তাঁর চেম্বারে আর মক্কেল ধরে না।
এই ঘটনার কিছুকাল পরে ঢাকা ষড়যন্ত্র মামলা (১৯১০-১১) উপস্থিত হয়। এবারও তিনি আসামির পক্ষে দাঁড়ালেন। এই মোকদ্দমায়ও দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ ত্যাগের পরিচয় প্রদান করলেন। এই মামলায় তিনি মোটেই টাকা-পয়সা নেননি। এই ত্যাগ তাঁর ভাগ্যোন্নতির পথ প্রশস্ত করে দিল। কথায় বলে, ‘এক দিলে আর পায়’—এ কথা সত্য হলো। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের কাজে আমরা তার সত্যতা স্পষ্টরূপে বুঝতে পারি।
তখন সমকালে সকলেই দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশকে ব্রিফ দিতে ব্যস্ত। সকলেরই বিশ্বাস হলো, তাঁর মতো আইনজ্ঞ ও বক্তা কলকাতা হাইকোর্টে দ্বিতীয় আর নেই। তাঁর বিস্তর অর্থোপার্জন হতে লাগল, যেন দুই হাতে ঠেলে তাঁর ঘরে টাকা আসতে লাগল।
তাঁর হৃদয়ের উদারতা ও আচরণে মধুরতা সকলকে মুগ্ধ করত। তিনি কী করে যে একজন বড় ব্যারিস্টার হয়েছিলেন, তা নিজেই জনৈক বন্ধুর কাছে বলেছিলেন। তিনি উক্ত বন্ধুকে বলেছেন, “আমি ছিলেম কবি, হলাম ব্যারিস্টার। তোমরা সকলে জান আমি মস্ত ব্যারিস্টার, খুব আইন জানি—সেসব কিছুই নয়। ব্রিফ পেয়েই আগে তোমরা আইনের পাতা ওলটাতে থাকো, আমি সর্বপ্রথমে আগাগোড়া ব্রিফখানা পড়তাম। এরূপ বরাবর পড়তাম; পড়তে পড়তে তার weak point চোখের সামনে ভেসে উঠত। তারই উপর আমার সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করতাম।” এই বলে তিনি বোমার মামলাসহ নানা দৃষ্টান্ত দিলেন।
দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ বলতেন, “সকলেই কাজ করবার আগে অনেক ভাবনা-চিন্তা করে, কাজের ফলাফলের বিবেচনা করে, কিন্তু আমি তা কখনো করিনি। ফলাফল না ভেবে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছি। আমি কখনো আগুপিছু ভেবে কাজ করিনি।”
দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ অনেক টাকা উপার্জন করতেন। কোনো কোনো মাসে তাঁর ৪০-৫০ হাজার টাকা আয় হতো। কিন্তু সঞ্চয় করতেন না। সঞ্চয় করা যেন তাঁর প্রকৃতিতে ছিল না। অধিকাংশ টাকাই পরার্থে ব্যয় করতেন। কোনো সাহায্যপ্রার্থী তাঁর দ্বারে এসে বিমুখ হতো না। জনৈক ভদ্রলোক বলেছেন, তিনি তাঁর পিতার সঙ্গে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের গৃহে বসেছিলেন। তাঁর পিতা দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের বিশেষ বন্ধু ছিলেন। নানা কথাবার্তা হচ্ছে, এমন সময় একজন ভিক্ষুক এসে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের কাছে কিছু সাহায্য প্রার্থনা করল। প্রার্থী কন্যাদায়গ্রস্ত। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ তৎক্ষণাৎ সেই ভিক্ষুককে ৫০ টাকা দিতে আদেশ করলেন। সকলে চমকিত হয়ে গেল। ভিক্ষুক নিতে চায় না; সে মনে করল বুঝি-বা ভুল হয়েছে। ভিক্ষুকের হাতের খাতাটা খুলে দেখা গেল, সে আরও অনেক বড় বড় লোকের বাড়িতে গেছে। কে কত দিয়েছে সেই খাতায় লেখা ছিল। কলকাতার একজন ধনকুবের চার আনা দিয়েছেন। কেউ কেউ আট আনা, বড়জোর এক টাকা।
একবার কোনো পল্লিগ্রামের একজন ভদ্রলোক নানা কারণে নিজের বাড়িঘর ছেড়ে শহরে এসে উপস্থিত হন। কিছুদিন পরে ভদ্রলোকটির মৃত্যু হয়। পরিবারে ৩-৪ জন লোক, কোনোমতেই এদের খাওয়া-পড়া চলে না। নিতান্ত দুরবস্থায় পড়ে তারা পরদুঃখকাতর দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের সাহায্য প্রার্থনা করল। তিনি প্রতি মাসে তাদের ১০ টাকা করে পাঠাতেন। তাদের মাসের পয়লা তারিখে টাকা আসত, কখনো দুই-একদিন এদিক-সেদিক হতো না।
পরের দুঃখ-কষ্ট দেখলে, দেশের কাজ উপস্থিত হলে তাঁর খরচের হিসাব থাকত না। তাঁর অর্থে কত গরিব ও কত বিধবা নারীর অন্ন-বস্ত্রের সংস্থান হয়েছে, কত গরিব ছেলের লেখাপড়া শিক্ষার ব্যবস্থা হয়েছে, তা অতি কম লোকেই জানে।
দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ তাঁর জনৈক স্নেহভাজনকে বলেছিলেন, “দেখ, প্র্যাকটিস করতে গেলে দেশের কাজ করা চলে না। এ বছর পাঁচ লাখ টাকা রোজগার করলাম কিন্তু একটা পয়সাও থাকে না; দেশের কাজ তেমন কিছু করতে পারলাম না। আমার কিছু দেনা রয়েছে, সেগুলো শোধ হয়ে গেলেই ব্যবসায় ছেড়ে সম্পূর্ণভাবে দেশের কাজে লাগব। কিন্তু বছরের পর বছর যাচ্ছে, ঋণ আমার বেড়েই চলেছে। নিজের জন্য ভাবি না; কষ্ট তো প্রথম জীবনেই দেখেছি। ট্রামের ভাড়া বাঁচাবার জন্য হাইকোর্ট থেকে বিকেলে ফেরার সময় হেঁটে এসেছি এবং এমন দিনও গেছে যেদিন হয়তো ৯/৭ আনা বই পরিবারের সম্বল ছিল না। আর যদি দশটা বছরই বাঁচি, প্র্যাকটিস ছাড়লেও এক রকম করে সুখে-দুঃখে যাবে, কিন্তু একটা কেবল ভাবনা হয়—অনেকগুলো লোক আমার কাছে মাসিক সাহায্য পায়; সে বেচারাদের কী হবে?”
পরদুঃখে কাতর না হয়ে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ অপরাপর উপার্জনশীল ব্যারিস্টারের মতো সঞ্চয়ে মনোনিবেশ করলে তিনি একজন বিরাট জমিদার হতে পারতেন। কিন্তু সঞ্চয়ে তিনি উদাসীন ছিলেন। দরিদ্রের দুঃখ দেখলে তাঁর মন গলে যেত, সঞ্চয়ের কথা মনেই থাকত না।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য প্রভৃতি জনহিতকর অনুষ্ঠানে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ বহু অর্থ দান করেছেন। জাতীয় শিক্ষার উন্নতির জন্য তাঁর সর্বস্ব দান কারো অবিদিত নয়। বাংলা ভাষার উন্নতিকল্পে, বেলগাছিয়া মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য, কলকাতার ব্রাহ্ম স্কুলের নতুন বাড়ির নির্মাণ করবার নিমিত্ত তিনি অনেক টাকা দান করেছেন। পুরুলিয়াতে তাঁর পৈতৃক এক বিরাট পাকা বাড়ি ছিল। সেই বাড়িতে তিনি অনাথ-আতুর-আশ্রমের জন্য মাসিক দুই হাজার টাকা খরচ করতেন।
কোনো এক দৈব দুর্বিপাকে নদীয়ায় নিত্যানন্দ আশ্রমের কাজ বন্ধ হয়েছিল। এটা দেখে তিনি নদীয়ায় নিত্যানন্দ আশ্রমের সঙ্গে এক বন্দোবস্ত করলেন। এই উপলক্ষে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ এই আশ্রমে দুই লক্ষ টাকা দান করলেন। ভবানীপুরের অনাথ আশ্রমেও তিনি অনেক টাকা দান করেছেন। ১৯১৯ সালে পূর্ববঙ্গে দুর্ভিক্ষের সময় ১০ হাজার টাকা দান করেন এবং ধনী মাড়োয়ারিদের নিকট হতেও বিস্তর অর্থ সংগ্রহ করে দুর্ভিক্ষপীড়িত লোকদের জীবন রক্ষা করেছেন।
চাঁদপুরের শ্রমিক বিভ্রাটকালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ সামান্য কুলিদের দুঃখে আত্মহারা হয়ে কী করেছিলেন, মি. এন্ড্রুজ সাহেব তা সংক্ষেপে বলেছেন: “চাঁদপুরে যখন কুলি নির্যাতন হয়, সে সময়কার একটা ঘটনা আমার বেশ মনে আছে। চাঁদপুরে কুলিদের মধ্যে যখন বিসূচিকার প্রবল প্রকোপ, তখন দেশবন্ধু গোয়ালন্দে পৌঁছিয়া দেখেন ধর্মঘটের জন্য স্টিমার বন্ধ। ভীষণ ঝড় প্রবাহিত হচ্ছে, নদী তরঙ্গমালা বিপদসংকুল। সেই সময় নদীতে সচরাচর যারা জলপথে যাতায়াত করে, তারাও যেতে সাহস করে না। দেশবন্ধু জীবনের ভয় না করে একখানা দেশীয় নৌকায় সরাসরি গোয়ালন্দ হতে চাঁদপুরে উপস্থিত হলেন। দিল্লিতে মহাত্মা গান্ধী বিশ দিবস ব্যাপী অনশন ব্রত পালন করতে আরম্ভ করলে দেশবন্ধু কলকাতা হতে দিল্লিতে আগমন করেন। তখন তাঁর শরীর অত্যন্ত রুগ্ন ছিল। আমি তাঁর উদারতা ও দেশের কাজে অসীম সাহসিকতা দেখে বিস্মিত হয়েছি।”
দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ মানুষকে খুব ভালোবাসতেন। মানুষের জন্য তাঁর প্রাণ কাঁদত। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের রাজনীতির ক্ষেত্রে যোগদানের সময় ধরা যায় ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের আন্দোলন হতে। ১৯১৫ সালে ভবানীপুরে কংগ্রেসের প্রাদেশিক কনফারেন্সের অধিবেশন হয়। সেই অধিবেশনে চিত্তরঞ্জন সভাপতি হয়েছিলেন।
১৯১৮ সালে দিল্লি ও বোম্বাইর কংগ্রেসে তিনি ‘মন্টেগু রিফর্ম’-এর প্রতিবাদ করেছিলেন। ১৯১৯ সালে পাঞ্জাবের দুর্ঘটনার পর কংগ্রেসের নিয়োগানুসারে তিনি বহু ক্ষতি স্বীকার করে সেখানে গমন করেন। দীর্ঘ চার মাস কাল পণ্ডিত মদনমোহন মালব্য, পণ্ডিত মতিলাল নেহেরু এবং মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে ব্রিটিশ অত্যাচারের অনুসন্ধান করেছিলেন।
১৯২০ সালে কলকাতায় ‘স্পেশাল কংগ্রেসে’ মহাত্মা গান্ধী ‘সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা বর্জন’ এই মত অবলম্বন করলেন। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের সাথে কোনো কোনো বিষয় নিয়ে মতভেদ হয়। কিন্তু তাঁর আপত্তি টিকল না। তার তিন মাস পরে নাগপুরে গিয়ে মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে তিনি একমত হন। নাগপুর কংগ্রেসে অসহযোগ মন্ত্র গ্রহণ করে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ বাংলায় ফিরে আসেন ও রাজনৈতিক কাজ আরম্ভ করেন। তিনি বুঝলেন—আরামে থেকে, ব্যারিস্টারি করে এ কাজ চলবে না, দেশের রাজনৈতিক কাজ করতে হবে, না হলে দেশের লোক কথা শুনবে না। এভাবে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ বিপুল আয়ের আইন ব্যবসায় ছাড়লেন, হ্যাট-কোট ছাড়লেন, সমুদয় বিলাস-ব্যসন পরিত্যাগ করলেন। সাহেবি ড্রেস ছেড়ে মোটা ধুতি, মোটা চাদর, মোটা জামা গায়ে দিয়ে রাস্তায় বের হলেন। দেশের জন্য তাঁর কী বিরাট ত্যাগ! ভারতবাসী যেদিন তাঁর অনুকরণ করতে পারবে, সেদিন ধন্য হবে। দেশের জন্য এরূপ সর্বস্বত্যাগ কোনো দেশে দেখা যায় না। এই সময়ে তিনি ‘দেশবন্ধু’ উপাধি পেলেন।
১৯২১ সালে তিনি প্রবলভাবে রাজনৈতিক আন্দোলনে যোগদান করলেন। তাঁর অনুপ্রেরণায় ছাত্ররা দলে দলে স্কুল ছাড়ল, কলেজ ছাড়ল, উকিল ওকালতি ছাড়ল, মোক্তার মোক্তারি ছাড়ল—চারিদিকে ‘ছাড়ার’ এক সাড়া পড়ে গেল। বাংলায় এক ভাবের বন্যা বয়ে গেল।
দোকানপাটে পিকেটিং আরম্ভ হয়ে গেল। ছেলেরা সব দলে দলে কারাবরণ করতে লাগল। দেশবন্ধুর একমাত্র পুত্র চিররঞ্জনও ছয় মাসের জন্য জেলে গেল। চিত্তরঞ্জনের পত্নী বাসন্তী দেবী ও ভগিনী ঊর্মিলা দেবী গ্রেপ্তার হলেন। অবশেষে দেশবন্ধু স্বয়ং গ্রেপ্তার হয়ে ছয় মাস জেলে অন্তরীণ হলেন।
কারাগারে যাত্রাকালে দেশবন্ধুকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “আপনার খাবার কি বাড়ি হতে হাজতে পাঠানো হবে?” দেশবন্ধু উত্তর করলেন, “না, তার প্রয়োজন নেই। সাধারণ জেল-কয়েদির খানাই আমার পক্ষে যথেষ্ট হবে।” দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ বলতেন: “দুঃখ-বিপদের মধ্যে দিয়ে জাতির উদ্ভব হয়ে থাকে। এই বিপদ আপনাদের সাহস ও ধৈর্যের সাথে সহ্য করতে হবে। আপনারা অহিংসার পথ অবলম্বন করবেন।”
১৯২১ সনের ১৪ই ফেব্রুয়ারি কলকাতার লালবাজারের ব্যাঙ্কশাল স্ট্রিটের পুলিশ আদালতে দেশবন্ধুর বিচার হলো। তিনি শান্তভাবে কাঠগড়ায় দণ্ডায়মান থাকলেন। চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট বিচারে বসে দেশবন্ধুকে জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনি কিছু বলতে চান?” তিনি গম্ভীরভাবে উত্তর দিলেন, “না।” তখন ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব দেশবন্ধুকে ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করলেন। শুনে তিনি কোনো কথাই বললেন না। দণ্ডাদেশে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ সর্বতোভাবে অহিংস নীতি অবলম্বন করেছিলেন। অসাধারণ আইনজ্ঞ হয়েও তিনি আত্মপক্ষ সমর্থন করলেন না। হাসিমুখে কারাবরণ করলেন।
কারাবাসে দেশবন্ধুর অসুখের জন্য তাঁর খাবার বাড়ি হতে আসত। সেখানেও কিছু কিছু রান্না হতো। তাঁর বাড়ি হতে যে খাবার আসত অথবা সেখানে যা পাক হতো, তা তিনি একা খেতেন না; অন্যান্য কয়েদিদেরও দিতেন।
কারাবাসে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ একটু সময়ও নষ্ট করতেন না। সকালে-বিকালে সব সময়েই তিনি পড়াশোনা করতেন। ছয় মাস জেল ভোগ করে মুক্তিলাভের পর দেশবন্ধুর মতের পরিবর্তন হয়। ১৯২২ সালের গয়া কংগ্রেসের সভাপতি হয়ে তিনি তাঁর মত প্রচার করলেন—সাম্রাজ্যের মধ্যে থেকে সহযোগিতা বর্জন করতে হবে। তিনি কংগ্রেসের কাছে কাউন্সিলে প্রবেশ লাভের অনুমতি চাইলেন। কংগ্রেস সে প্রস্তাব অনুমোদন করল না। তখন তিনি নিজেই ‘স্বরাজ পার্টি’ নাম দিয়ে একটা নতুন দলের সৃষ্টি করলেন। একমাত্র তাঁর অসাধারণ ব্যক্তিত্বের প্রভাবে এই দল সর্বভারতে জনপ্রিয় হয়েছিল। ১৯২৩ সালের দিল্লির স্পেশাল কংগ্রেস স্বরাজ দলকে কাউন্সিলে প্রবেশ করবার অনুমতি প্রদান করল।
তারকেশ্বর সমস্যায় (ব্রিটিশ রাজের সময় ১৯ শতকের বাংলায় একটি পাবলিক কেলেঙ্কারি) দেশবন্ধু নেতৃত্ব গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর চেষ্টায় তারকেশ্বরের অনাচার কতকটা প্রশমিত হয়। বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মিলনের ফরিদপুর অধিবেশনে দেশবন্ধু যে অভিভাষণ পাঠ করেছেন, তাতে তিনি সকলকে মিলনের বাণী শুনিয়েছেন। অকালেই দেশবন্ধুর শরীর ভেঙে গিয়েছিল। ভগ্ন স্বাস্থ্য নিয়ে তিনি নানা কাজে ব্যাপৃত ছিলেন। কলকাতা কর্পোরেশনে মেয়রের পদে অধিষ্ঠিত থাকাকালে তিনি সুশৃঙ্খলা ও সুবিচারের সাথে কাজ পরিচালনা করেছিলেন যা আজও ভাবলে বিস্মিত হতে হয়। মাওলানা আবুল কালাম আজাদ মন্তব্য করেছেন যে, ‘তিনি (দেশবন্ধু) অকালে মারা না গেলে দেশে নতুন অবস্থা সৃষ্টি করতেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘পরিতাপের বিষয় এই যে, তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর কিছুসংখ্যক অনুসারী তাঁর অবস্থানকে জর্জরিত করে এবং তাঁর ঘোষণা প্রত্যাখ্যান করে। এর ফলে বাংলার মুসলমানরা কংগ্রেস থেকে দূরে সরে যায় এবং (ভারত) বিভক্তির প্রথম বীজ বপন করা হয়।’
বিশ শতকে সর্বভারতের সবচেয়ে প্রগতিশীল রাজনৈতিক নেতা দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের চিন্তাধারা সমকালে যেমন প্রাসঙ্গিক ছিল, তেমনি প্রাসঙ্গিক একুশ শতকের বিশ্বেও। আমরা মনে করছি, একুশ শতকেও বিশ শতকের এই জাতীয়তাবাদী নেতার চিন্তাধারা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। বিশ শতকের বিশ্বে মানবতাবাদী নেতার অভাব ছিল না; কিন্তু একুশ শতকের পৃথিবীতে মানবতাবাদী নেতার অভাব অত্যন্ত প্রকট। পৃথিবীর ইতিহাসে মানবজাতি একুশ শতকের মতো কখনো আর এমন সংকটে পড়েনি। তাই বিগত শতকগুলোতে যারা মানুষকে মুক্তির বাণী শুনিয়ে গেছেন, তাঁদের কথাগুলো আজ আবার মানতে হবে, শুনতে হবে এবং এখানেই দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ প্রাসঙ্গিক।
লেখক: শাহ্ মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, গবেষক ও প্রাবন্ধিক
সহায়ক গ্রন্থ:
১. ভারতবর্ষের ইতিহাস: শ্রী বিনয় কুমার মুখোপাধ্যায়, এম.এ, পৃ. ২১৫, বৃন্দাবন ধর অ্যান্ড সন্স, আশুতোষ লাইব্রেরি, কলকাতা।
২. বাংলাপিডিয়া: সিরাজুল ইসলাম (প্রধান সম্পাদক), তৃতীয় খণ্ড, প্রকাশ কাল ২০০৩, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, ঢাকা, পৃ. ৩৫৬।

