বাংলাদেশের প্রথম ‘নারী অ্যাডভোকেট’ মেহেরুন্নেসা খাতুন
বাংলাদেশের প্রথম ‘নারী অ্যাডভোকেট’ মেহেরুন্নেসা খাতুন

বাংলাদেশের প্রথম ‘নারী অ্যাডভোকেট’ মেহেরুন্নেসা খাতুন

আরিফ খান : বর্তমান বাংলাদেশের ভূখণ্ডে নারীদের আইনি অধিকার নিয়ে আজ যত আলোচনা হয়, তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল ষাটের দশকের শুরুতে। তবে এই ইতিহাসের সূক্ষ্ম বিন্যাসটি বেশ আকর্ষণীয়। যুক্তরাজ্য থেকে ব্যারিস্টারি পড়ে এসে সালমা সোবহান ১৯৫৯ সালে তৎকালীন গোটা পাকিস্তানের প্রথম নারী ব্যারিস্টার হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিলেন এবং করাচিতে প্র্যাকটিস শুরু করেছিলেন (পরবর্তীতে ১৯৬২ সালে তিনি ঢাকায় এসে আইন শিক্ষাদানে যুক্ত হন, তবে তিনি কোর্ট প্র্যাকটিসে যুক্ত হননি)। কিন্তু সম্পূর্ণ দেশীয় পরিমণ্ডলে পড়াশোনা করে, এ দেশের মাটি ও আদালতের চত্বর থেকে প্রথম নারী ‘অ্যাডভোকেট’ (হাইকোর্টের তালিকাভুক্ত আইনজীবী) হিসেবে ইতিহাস গড়েছিলেন অ্যাডভোকেট মেহেরুন্নেসা খাতুন।

১৯৬১ সালে যখন তিনি ঢাকা হাইকোর্টে তালিকাভুক্ত হন, তখন মুসলিম সমাজে নারীর ঘরের বাইরে বের হওয়াাই ছিল এক বিরাট সামাজিক ট্যাবু। না ছিল কোনো নারী সহকর্মী, না ছিল আদালত প্রাঙ্গণে নারীদের ন্যূনতম সামাজিক ও শারীরিক গ্রহণযোগ্যতা। কতটা প্রতিকূল এবং পুরুষতান্ত্রিক ছিল তৎকালীন আইনি অঙ্গন, তা বোঝা যায় একটি পরিসংখ্যান দেখলেই। মেহেরুন্নেসা খাতুনের পথ ধরে গোটা ষাটের দশকে এই ভূখণ্ডে মাত্র আর দুজন নারী আইন পেশায় আসার সাহস দেখিয়েছিলেন। তাঁরা হলেন—অ্যাডভোকেট আয়েশা খাতুন (১৯৬৭ সালের ৪ঠা নভেম্বর আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন) এবং অ্যাডভোকেট কামরুন নাহার লাইলী (১৯৬৯ সালের ৫ই ফেব্রুয়ারি আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন)। এই দুই অনুজের আগমনের আগে, দীর্ঘ কয়েক বছর মেহেরুন্নেসা খাতুনকে সম্পূর্ণ একাকী লড়তে হয়েছে তৎকালীন পুরুষতান্ত্রিক আইনি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে।

প্রারম্ভিক জীবন ও শিক্ষা

১৯২২ সালের ২৩শে ডিসেম্বর, নোয়াখালীর এক রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারে মেহেরুন্নেসার জন্ম। তখন চারপাশের সমাজ ছিল নারীদের জন্য এক নিচ্ছিদ্র অন্ধকার কুঠুরি। সেই যুগে মুসলিম মেয়েদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার কথা ভাবা যেখানে ছিল এক অকল্পনীয় সামাজিক অপরাধ, সেখানে মেহেরুন্নেসা খাতুন এক পরম সৌভাগ্যের আলো নিয়ে এসেছিলেন তাঁর পিতার হাত ধরে। তাঁর পিতা খানবাহাদুর আবদুল গোফরান ছিলেন একাধারে মেধাবী আইনজীবী, পাবলিক প্রসিকিউটর, বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ এবং পরবর্তীতে ১৯৪৬ সালে অবিভক্ত বাংলার সোহরাওয়ার্দী মন্ত্রিসভার নাগরিক সরবরাহ (Civil Supplies) মন্ত্রী। আধুনিক মন ও মেধার অধিকারী পিতা সমাজ ও সময়ের চেয়ে এগিয়ে গিয়ে মেয়ের শিক্ষার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করেছিলেন। পিতার এই অকুতোভয় মনোভাব ও অকুণ্ঠ সমর্থনই মেহেরুন্নেসার অবচেতনে এক গভীর দায়িত্ববোধ এবং দৃঢ় নেতৃত্বের ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছিল।

পিতার দেওয়া সেই সাহসের ওপর ভর করেই মেহেরুন্নেসা ১৯৪০ সালে সাফল্যের সাথে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি পাড়ি জমান কলকাতায়। সেখানকার বিখ্যাত লেডি ব্র্যাবোর্ন কলেজে (১৯৪১-৪২) পড়ার সময়ই তাঁর ভেতরের সহজাত নেতৃত্বগুণের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। কলেজের অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ‘কলেজ প্রিফেক্ট’ হিসেবে নির্বাচিত হয়ে তিনি এক নিবেদিতপ্রাণ, সুশৃঙ্খল এবং সক্রিয় ছাত্রনেতা হিসেবে সবার নজর কাড়েন।

ইন্টারমিডিয়েট ডিগ্রি অর্জনের পর মেহেরুন্নেসা এক তরুণ বিশ্ববিদ্যালয় প্রভাষক এম. ফজলুর রহমানের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ফজলুর রহমান পরবর্তীতে দেশের একজন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ (ডিপিআই এবং টেক্সটবুক বোর্ডের চেয়ারম্যান) হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। বিয়ের পর সাধারণত তৎকালীন সমাজে মেয়েদের শিক্ষার ইতি ঘটলেও, মেহেরুন্নেসার ক্ষেত্রে তা ঘটেনি। উদার ও আধুনিক মনের স্বামী ফজলুর রহমানের সক্রিয় উৎসাহ ও অনুপ্রেরণায় তিনি একদিকে যেমন নিষ্ঠার সাথে সংসারের সমস্ত গুরুদায়িত্ব সামলেছেন, ঠিক তেমনি অন্য হাত সচল রেখেছেন শিক্ষার আলোয়। বিয়ের পর এক তীব্র পারিবারিক ও সামাজিক ভারসাম্যের যুদ্ধ জয় করে ১৯৪৮ সালে তিনি ব্যাচেলর অব আর্টস (বিএ) সম্পন্ন করেন। এর বেশ কয়েক বছর পর, স্বামীর অবিরাম তাগিদ ও অনুপ্রেরণাকে সঙ্গী করে ১৯৬১ সালে তিনি ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে তাঁর জীবনের সেই ঐতিহাসিক এলএলবি (LL.B) ডিগ্রি অর্জন করেন—যা পরবর্তীতে এ দেশের আইনি ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল।

আদালত কক্ষের ‘পুরুষালি’ কাঠামো ও মেহেরুন্নেসার প্রথম যুদ্ধ

১৯৬১ সালে ঢাকা হাইকোর্টে প্রথম নারী আইনজীবী হিসেবে যখন মেহেরুন্নেসা খাতুন পা রাখেন, তখন চারপাশের আইনি পরিবেশ ছিল নারীদের জন্য সম্পূর্ণ সংবেদনহীন ও প্রতিকূল। তৎকালীন আদালত চত্বর, এজলাস কিংবা বার অ্যাসোসিয়েশন—সবকিছুই তৈরি হয়েছিল কেবলই পুরুষদের মনস্তত্ত্ব ও প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে।

সে সময় আদালত প্রাঙ্গণের সবচেয়ে রূঢ় ও অস্বস্তিকর বাস্তবতাটি ছিল পরিকাঠামোগত বর্জন। পুরো হাইকোর্ট চত্বরে নারী আইনজীবী কিংবা নারী মক্কেলদের জন্য কোনো পৃথক শৌচাগার বা পোশাক পরিবর্তনের সাধারণ কক্ষটুকুও ছিল না। এই বৈষম্যটি কেবল একটি শারীরিক বা প্রাত্যহিক অসুবিধাই ছিল না, বরং এটি ছিল পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থার এক নীরব ও শক্তিশালী মনস্তাত্ত্বিক বার্তা—যা স্পষ্ট বুঝিয়ে দিত যে, আইন অঙ্গনটি নারীদের জন্য নয় এবং এখানে তাদের আগমন মোটেও কাঙ্ক্ষিত নয়।

মেহেরুন্নেসা খাতুনের জীবনের প্রথম আইনি লড়াইটি তাই কোনো মক্কেলের অধিকার আদায়ের জন্য ছিল না, তা ছিল বিচারালয়ের এই চরম বৈষম্যমূলক ও পুরুষালি কাঠামোর বিরুদ্ধে। তিনি দমে যাননি; বরং এই পরিকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার বিরুদ্ধে একাই এক অনমনীয় ও আপসহীন সংগ্রাম শুরু করেন। তাঁর সেই অনড় অবস্থান এবং ধারাবাহিক প্রতিবাদের মুখে বাধ্য হয়েই পরবর্তীতে আদালত ভবনগুলোতে ধীরে ধীরে পরিবর্তন শুরু হয়। মেহেরুন্নেসা খাতুন সেদিন একাকী যে অধিকারের দেয়াল ভেঙেছিলেন, তারই সুফল আজ দেশের সুপ্রিম কোর্টসহ দেশের হাজার হাজার নারী আইনজীবী অত্যন্ত অনায়াসে এবং গৌরবের সাথে ভোগ করছেন।

পর্দানশিন ও সুবিধাবঞ্চিত নারীদের কণ্ঠস্বর

আইন পেশাকে মেহেরুন্নেসা কখনোই অর্থ উপার্জনের হাতিয়ার করেননি। তিনি জানতেন, রক্ষণশীল সমাজের কঠোর নিয়মের বেড়াজালে বন্দি নারীরা পুরুষ আইনজীবীদের সামনে এসে নিজেদের সমস্যার কথা, বিশেষ করে পারিবারিক বা সম্পত্তির অধিকার বঞ্চিত হওয়ার বেদনা প্রকাশ করতে পারতেন না। মেহেরুন্নেসা সেই সব ‘পর্দানশিন’ এবং গ্রামীণ অসহায় নারীদের জন্য আশার আলো হয়ে দাঁড়ান। তিনি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে (প্রো-বোনো) এই সুবিধাবঞ্চিত নারীদের আইনি লড়াই লড়েছেন এবং তাদের আইনি ব্যবস্থার জটিলতা বুঝতে সাহায্য করেছেন। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, তিনি তাঁর সারাজীবনে কখনও অসহায় ও অধিকারবঞ্চিত মানুষের অধিকারের জন্য লড়াই করা থামিয়ে দেননি। পরবর্তীতে ১৯৭৯ সালে তাঁর হাত ধরেই প্রতিষ্ঠিত হয় ‘জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি’, যার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন তিনি।

রাজনীতি, ভাষা আন্দোলন ও সমাজ সংস্কারে অপরাজেয় অগ্রদূত

আইনজীবী পরিচয়ের সমান্তরালে মেহেরুন্নেসা খাতুনের আরেকটি পরিচয় ছিল—তিনি ছিলেন একাধারে তুখোড় মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক সংগঠক, ভাষা সৈনিক এবং দূরদর্শী সমাজ সংস্কারক। পঞ্চাশের দশকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি যখন উত্তাল, ঠিক তখন ময়মনসিংহের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে শিক্ষার আলো ছড়ানো এবং নারীদের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে সম্মুখ সমরের সেনাপতি হয়ে ওঠেন তিনি।

১৯৫০ থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত মেহেরুন্নেসা খাতুন ময়মনসিংহ মুসলিম গার্লস হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। একজন শিক্ষিকা হিসেবে তিনি কেবল শ্রেণীকক্ষেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, বরং ছাত্রীদের মাঝে স্বাধিকার ও দেশপ্রেমের বীজ বুনে দিয়েছিলেন। ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে যখন রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে পুরো দেশ ফুঁসে ওঠে, তখন রক্ষণশীলতার শৃঙ্খল ভেঙে ময়মনসিংহের নারী সমাজকে রাজপথে নামিয়ে আনার ঐতিহাসিক দায়িত্বটি নেন মেহেরুন্নেসা। তাঁর নেতৃত্বে ও সাহসিকতায় স্কুলের তরুণী ছাত্রীরা দলে দলে ভাষা আন্দোলনের মিছিলে যোগ দেয়। তৎকালীন সময়ে পূর্ব পাকিস্তানের মফস্বল একটি শহরে মুসলিম ছাত্রীদের এভাবে সংগঠিত করে ভাষার দাবিতে রাস্তায় নামানো ছিল এক অবিশ্বাস্য এবং বৈপ্লবিক ঘটনা।

একই সময়ে তিনি তৎকালীন শীর্ষস্থানীয় নারী সংগঠন ‘অল পাকিস্তান উইমেনস অ্যাসোসিয়েশন’ (APWA)-এর ময়মনসিংহ শাখার সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন (যা দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ‘বাংলাদেশ মহিলা সমিতি’ নামে পুনর্নামকরণ করা হয়)। আপাতদৃষ্টিতে উচ্চবিত্ত নারীদের সংগঠন মনে হলেও, মেহেরুন্নেসা একে দুস্থ নারীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা, সেলাই প্রশিক্ষণ এবং দুর্যোগে ত্রাণ বিতরণের এক কার্যকর জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করেন।

তবে তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা ছিল যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের ঐতিহাসিক প্রাদেশিক নির্বাচন ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিতে এক যুগান্তকারী অধ্যায়। মেহেরুন্নেসা অনুধাবন করেছিলেন, নারীদের প্রকৃত মুক্তি ও ক্ষমতায়ন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছাড়া অসম্ভব। তাই তিনি সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত হন এবং যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে ময়মনসিংহ অঞ্চল থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

সেই রক্ষণশীল যুগে, যেখানে নারীদের ভোটের অধিকার বা জনসমক্ষে আসাই ছিল প্রশ্নবিদ্ধ, সেখানে তিনি সরাসরি জনগণের বিপুল ভোটে জয়লাভ করে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য (M.P.A.) নির্বাচিত হন। তিনি ছিলেন সেই আইনসভার সরাসরি নির্বাচিত হাতেগোনা কয়েকজন নারী নেত্রীর মধ্যে অন্যতম, যা তৎকালীন পুরুষতান্ত্রিক রাজনৈতিক মহলে এক বিশাল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।

আইনসভার সদস্য হিসেবে মেহেরুন্নেসা খাতুন তৎকালীন মুসলিম লীগ সরকারের শোষণের বিরুদ্ধে বিরোধী দলের একনিষ্ঠ ও আপসহীন কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিলেন, যার ফলে তাঁর প্রতিটি সমাজকল্যাণমূলক উদ্যোগে শাসকগোষ্ঠী পদে পদে তীব্র বাধা সৃষ্টি করত। তবে সমস্ত রক্তচক্ষু ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা উপেক্ষা করে তিনি ঢাকার ইডেন গার্লস কলেজের ছাত্রীদের তীব্র আবাসন সংকট দূর করতে নিরলস রাজনৈতিক লড়াই চালান এবং নিজের অনমনীয় জেদ ও দূরদর্শিতার প্রমাণ দিয়ে অবশেষে একটি আধুনিক ছাত্রী হোস্টেল নির্মাণ নিশ্চিত করেন; একই সাথে সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত ও প্রতিবন্ধী শিশুদের প্রতি গভীর মমত্ববোধ থেকে ময়মনসিংহের মৃতপ্রায় ‘বধির ও মূক বিদ্যালয়’ (Deaf and Dumb School)-টিকে একক প্রচেষ্টায় পুনর্গঠন ও পুনরুজ্জীবিত করে নিজের মানবিক সত্তার এক অনন্য নজির স্থাপন করেন।

১৯৭১: যুদ্ধ ও বীরাঙ্গনাদের পুনর্বাসন

১৯৬৯ সালে মাত্র ৫০ বছর বয়সে স্বামী মারা গেলে তরুণী বিধবা হিসেবে মেহেরুন্নেসা সন্তানদের একা বড় করার গুরুদায়িত্ব নেন। এর মধ্যেই আসে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ। নিজের জীবন বাজি রেখে মুক্তিযোদ্ধা ছেলে ও আত্মীয়দের জন্য ওষুধ ও গরম কাপড় সংগ্রহ করে বিশ্বস্ত প্রতিবেশীদের বাড়িতে লুকিয়ে রাখতেন তিনি।

যুদ্ধের পর স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে বীরাঙ্গনাদের সামাজিক মর্যাদা ও পুনর্বাসনে ড. নীলিমা ইব্রাহিমের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেন মেহেরুন্নেসা। ‘জন্টা ক্লাব’-এর মাধ্যমে প্রায় ৫০ জন যুদ্ধবিধ্বস্ত নারীকে ট্রমা থেকে বের করে আনা, তাদের বিয়ে ও চাকরির ব্যবস্থা করা এবং অনাথ শিশুদের আন্তর্জাতিক দত্তক দেওয়ার মতো কঠিন কাজগুলো তিনি করেছিলেন অত্যন্ত নীরবে। অথচ এই অবদানের জন্য কখনো কোনো প্রচার বা আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি চাননি তিনি। কেউ জানতে চাইলে মিষ্টি হেসে বলতেন—”আমি কেবল সেটাই করেছি যা আমার মনে হয়েছে করা উচিত, তার বেশি কিছু নয়!”

শেষ জীবন

দীর্ঘদিন পর হলেও, ২০১১ সালে রাষ্ট্র এই মহান অগ্রপথিককে ‘রোকেয়া পদক’-এ ভূষিত করে। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাঁর রসবোধ, প্রখর স্মৃতিশক্তি আর কবিতা আবৃত্তির ক্ষমতা ম্লান হয়নি। সংসারের কঠিন দায়িত্ব এবং সমাজের বৃহত্তর আঙিনায় সমানতালে কাজ করার রহস্য জানতে চাইলে তিনি চোখ টিপে হাসতেন আর বলতেন—”পৃথিবী আমার ঘর, আর মানবজাতি আমার পরিবার।”

মেহেরুন্নেসা খাতুন কেবল একজন ব্যক্তি ছিলেন না, তিনি নিজেই ছিলেন এ দেশের আইনি ইতিহাসের এক জীবন্ত মহাকাব্য। যে সময়ে নারীদের ঘরের বাইরে আসাই ছিল অকল্পনীয়, সেই সময়ে তাঁর আদালত প্রাঙ্গণে পা রাখা ছিল এক নীরব বিপ্লব। অথচ চরম দুর্ভাগ্য এবং বিস্ময়ের বিষয় হলো, আমাদের নিজস্ব আইনি ও বিচারিক ইতিহাস সংরক্ষণের প্রতি সীমাবদ্ধ উদাসীনতা ও অবহেলার কারণে আজ আমাদের জাতীয় ইতিহাস থেকে অ্যাডভোকেট মেহেরুন্নেসা খাতুনের নামটি প্রায় সম্পূর্ণ মুছে গেছে! ভাবতেই অবাক লাগে, যে নারী এ দেশের হাজার হাজার নারীর জন্য আদালতে দাঁড়ানোর পথ তৈরি করে দিলেন, আজকের প্রজন্ম তাঁর নামটি পর্যন্ত জানে না। নিজের শিকড় আর অগ্রগামীদের ভুলে যাওয়ার এই জাতীয় সংস্কৃতি সত্যিই দুঃখজনক ও অগ্রহণযোগ্য। আমাদের উচিত ইতিহাসের পাতা থেকে ধুলো ঝেড়ে এই মহীয়সী নারীর অবদানকে সামনে আনা, যেন বাংলাদেশের প্রথম নারী অ্যাডভোকেট মেহেরুন্নেসা খাতুন বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে না যান, বরং প্রতিটি নতুন প্রজন্মের নারী আইনজীবীদের মনে সাহসের এক চিরন্তন মশাল হয়ে বেঁচে থাকেন।

২০১৩ সালের ২৪শে মে, ৯০ বছর বয়সে ঘুমের ঘোরে শান্তিতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই কিংবদন্তি। মেহেরুন্নেসা খাতুন আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক ও রক্ষণশীল সমাজের বুকে লাঙল চালিয়ে নারীদের জন্য তিনি যে আইনি ও সামাজিক পথ তৈরি করে দিয়ে গেছেন, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

[এই লেখার তথ্যসমূহ মেহেরুন্নেসার পরিবারের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে এবং সহযোগিতার জন্য তাঁর সুযোগ্য কন্যা অ্যাম্বাসেডর ইসমাত জাহানের প্রতি বিশেষ ধন্যবাদ।]

লেখক : আরিফ খান;সংবিধান বিশেষজ্ঞ এবং আইন ইতিহাসের গবেষক ও লেখক।