মোকাররামুছ সাকলান
মোকাররামুছ সাকলান

মৃত হয়েও সন্তানের বিরুদ্ধে বাদী হয়ে ফিরবেন মা নূরজাহান

২০২৬ সালের ১ জুন। ঢাকার মিরপুরের একটি বাসার দরজা ভাঙা হলো। ভেতরে বিছানায় এক বৃদ্ধা। নিস্তব্ধ। নিথর। ৭৫ বছর বয়সী নূর জাহান বেগম আর কাউকে ডাকবেন না। তাঁর ছেলে এ কে এম আনিসুর রহমান যুগ্ম সচিব, মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য। আরেক ছেলে পড়ান বুয়েটে। মেয়েটি একটি স্কুলের শিক্ষিকা। তিন সন্তান, তিনটি সম্মানিত পেশা, তিনজন সফল মানুষ—কিন্তু মায়ের শেষ সময়টুকুতে কেউ ছিলেন না। তিনি একা মারা গেলেন। একা। সম্পূর্ণ একা।

খবরটি ছড়াতেই দেশজুড়ে শোরগোল পড়ে গেল। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় নড়েচড়ে বসল দ্রুতগতিতে। এরপর প্রজ্ঞাপনে আনিসুর রহমানকে পদ থেকে প্রত্যাহার করে মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হলো। জানিয়ে দেওয়া হলো, অবিলম্বে যোগ দিন, নইলে চাকরিচ্যুত। রাষ্ট্রীয় জনপ্রশাসনমন্ত্রী টেলিভিশনের ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে গর্জে উঠলেন, ‘পিতামাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩ প্রয়োগ করা হবে।’ দেশ ভাবল, বিচার আসছে। আইন জেগেছে।

কিন্তু একটি করুণ প্রশ্ন কেউ করল না। যে আইনের কথা বলা হচ্ছে, সেই আইনে অভিযোগ কে করবে? কে গিয়ে আদালতে দাঁড়িয়ে বলবে, ‘আমার সন্তানেরা আমাকে ফেলে রেখেছে’? আইন বলে, সেই অধিকার একমাত্র পিতামাতার। নূর জাহান বেগম তো আর বলতে পারবেন না। তিনি মৃত। যে হাত কলম ধরতে পারে, যে কণ্ঠ বিচার চাইতে পারে—সে হাত এখন মাটি হয়ে গেছে, সে কণ্ঠ স্তব্ধ। তবে কি আইনও স্তব্ধ হয়ে যাবে? এই নিবন্ধ সেই প্রশ্নই তুলছে। যে মা আর নিজের হয়ে কথা বলতে পারেন না, আইনের কাছে তাঁর জন্য কি কোনো উত্তর আছে?

পিতামাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩ সাল; ২৭ অক্টোবর কার্যকর হয়েছিল। তখন আমরা গর্ব করেছিলাম—দক্ষিণ এশিয়ায় এই প্রথম। পিতামাতার ভরণপোষণ আর নিছক নৈতিক দায়িত্ব থাকল না, হয়ে উঠল ফৌজদারি বাধ্যবাধকতা। আইনটি তিনটি পবিত্র দায়িত্ব চাপিয়ে দিল সন্তানদের কাঁধে। এক, আর্থিক ভরণপোষণ: প্রত্যেক সন্তানকে নিজ আয়ের অনুপাতে মা-বাবার মাসিক খরচ দিতে হবে। দুই, আবাসন: মা-বাবাকে তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে কেউ আলাদা রাখতে পারবে না। তিন, সাক্ষাৎ: যে সন্তান দূরে থাকে, তাকে মাসে অন্তত একবার দেখা করতে হবে। এই দায়িত্ব ভঙ্গ মানে ফৌজদারি অপরাধ। শাস্তি? এক মাস জেল, বা পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা, অথবা দুটোই।

এবার আসুন সেই কাঁটার কাছে। ধারা ৭—আইনের প্রাণকেন্দ্র, আবার আইনের সবচেয়ে বড় ফাঁদ। উপধারা (১) বলছে, এই আইনের অপরাধ বিচার করবেন প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট। কিন্তু উপধারা (২) বলে, ‘সংশ্লিষ্ট পিতামাতার লিখিত অভিযোগ ছাড়া কোনো আদালত এই আইনের অধীন কোনো অপরাধ আমলে নিতে পারবে না।’ পড়ুন, আরেকবার পড়ুন। শব্দগুলো কঠিন, নিষ্ঠুর, অনমনীয়। আমলে নিতে লিখিত অভিযোগ লাগবে। আর সেই অভিযোগ আসতে হবে ‘সংশ্লিষ্ট পিতামাতা’র কাছ থেকে। অন্য কোনো পথ খোলা নেই। পুলিশ চার্জশিট দিতে পারবে না। রাষ্ট্র মামলা করতে পারবে না। এক ভাই আরেক ভাইয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে পারবে না। আইন নামক এই দুর্গের একটিমাত্র প্রবেশদ্বার; আর চাবি একমাত্র সেই হাতে, যে হাত আজ নিস্তেজ। নূর জাহান বেগম কোনো অভিযোগ করে যাননি। তিনি এখন নেই। দুর্গের দরজা বন্ধ। চিরতরে?

ধারা ৭(২) আসলে একটি করুণ অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সে অনুমান করে যে পিতা বা মাতা বেঁচে আছেন, আইনি লড়াই চালানোর সক্ষমতা রাখেন, এবং নিজের সন্তানদের বিরুদ্ধে আদালতে দাঁড়াতে রাজি আছেন। কিন্তু বাস্তবতা কি এত সরল? বাংলাদেশের বৃদ্ধ বাবা-মায়েরা প্রায়ই ভয় পান—ছেলেমেয়ের বিরুদ্ধে মামলা করলে সমাজ কী বলবে? অনেকে আবার সেই সন্তানের ওপরই পুরোপুরি নির্ভরশীল, তাই কাঠগড়ায় দাঁড়াতে চান না। কেউ কেউ শারীরিক বা মানসিকভাবে এতটাই ভেঙে পড়েন যে আদালতের সিঁড়ি ভাঙার শক্তি পান না। আর কেউ কেউ, নূর জাহানের মতো, চলে যান না ফেরার দেশে। নূর জাহানের ঘটনা পড়ে এই শেষ দলে। যে অবহেলাকে শাস্তি দিতে আইন তৈরি হয়েছিল, সেই অবহেলাই মুছে দিল একমাত্র মানুষটিকে, যে সেই শাস্তির চাকা ঘোরাতে পারত। এ এক আজব বিধি! এখানে একটা আইনি ও দার্শনিক প্রশ্ন জেগে ওঠে, যা শিরদাঁড়ায় শিহরণ তোলে—মৃত মাকে কি বাদী হিসেবে কল্পনা করা যায়? যিনি আর কথা বলতে পারেন না, তাঁর হয়ে আইন কি কথা বলতে পারে?

উত্তর সাদা-কালো ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ নয়। এটা আইনের নির্মাণ, সংবিধানের নীতি আর ন্যায়ের তত্ত্বের গভীরে ডুব দেওয়ার বিষয়। তিনটি শক্তিশালী দলিল আছে, যা এ যুদ্ধে হাতিয়ার হতে পারে।

প্রথম যুক্তিটি হাজার বছরের পুরোনো, ন্যায়পরতার ভিত—কোনো মানুষ নিজের অন্যায় থেকে লাভবান হতে পারে না। লাতিনে যাকে বলে, Nemo ex suo delicto meliorem suam conditionem facere potest (নিমো এক্স সুও দেলিক্তো মেলিওরেম সুয়াম কন্দিশিওনেম ফাসেরে পোতেস্ত)। এই মামলায় সন্তানেরা নীরবে ঠিক এই যুক্তিটাই দিচ্ছে—মা তো মৃত, কাজেই অভিযোগকারী কেউ নেই, মামলা চলতে পারে না। কিন্তু শুনতে কেমন লাগছে? তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের মূল ভিত্তিই হলো সেই অবহেলা, যে অবহেলা মায়ের মৃত্যু ডেকে এনেছে বা ত্বরান্বিত করেছে। সেই একই অবহেলাকে এখন ঢাল বানিয়ে তারা বিচার এড়াতে চাইছে! নিজের কৃতকর্মের চরম পরিণতিকেই যদি অপরাধী অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে, তবে তো আইনের সবচেয়ে বড় परिহাস হয়ে যাবে। এই নীতি ধারা ৭(২) মুছে দেয় না, কিন্তু আদালতকে এক নতুন চশমা এনে দেয়। যখন আইনের ফাঁক কাজে লাগিয়ে আসামি পালাতে চায়, তখন ন্যায়পরতার এই চিরন্তন নীতি দিয়ে আদালত সেই ফাঁক বন্ধ করতে পারে; অন্যথায় যে অযৌক্তিক পরিণতি দাঁড়াবে, তা রুখতে হবে।

দ্বিতীয় যুক্তি, আইনের উদ্দেশ্যের দিকে তাকান। সংবিধানের ১৫ ও ১৭ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রকে সুস্পষ্ট আদেশ দেয়—সব নাগরিকের, বিশেষ করে বয়স্কদের, মৌলিক চাহিদা ও মর্যাদা রক্ষা করতে হবে। এই আইন সেই পবিত্র আদেশেরই সন্তান। উদ্দেশ্যমূলক ব্যাখ্যার নিয়ম হলো, আইনকে এমনভাবে পড়তে হবে, যাতে তার জন্মের কারণ সার্থক হয়, ব্যর্থ না হয়। ধারা ৭(২) কেন আনা হয়েছিল? যাতে বাড়ির কাজে নাক গলানো প্রতিবেশী, কিংবা সম্পত্তির লোভী আত্মীয়, পিতামাতার নামে মিথ্যে মামলা করতে না পারে। উদ্দেশ্য ছিল পিতামাতার হাতে নিয়ন্ত্রণের রাশ দেওয়া। কিন্তু কখনোই ভাবা হয়নি, পিতামাতাকে যদি সেই অবহেলা হত্যাই করে ফেলে, যা এই আইন রুখতে চায়, তাহলে তার দায় কে নেবে? মৃত্যুই যদি সব জবাবদিহিতার যবনিকা টেনে দেয়, তাহলে আইনের পরম উদ্দেশ্যই তো ব্যর্থ। সুতরাং, সংবিধানের আলোয়, উদ্দেশ্যমূলক এক সাহসী পাঠ বলতে পারে—যখন মৃত্যু নিজেই অবহেলার সাক্ষী, তখন রাষ্ট্র নিজেই পারেন্স পাত্রিয়ায়ি (Parens Patriae) বা ‘জাতির অভিভাবক’ হিসেবে পিতামাতার শূন্য আসনে বসবে। রাষ্ট্র হবে মায়ের হারিয়ে যাওয়া কণ্ঠস্বর।

তৃতীয় যুক্তি সেই পারেন্স পাত্রিয়ায়ি-র (Parens Patriae) শেকড় ছোঁয়া। কমন ল’-এর এই অমর তত্ত্ব বলে, রাষ্ট্র তাদের চূড়ান্ত অভিভাবক, যারা নিজেদের রক্ষা করতে পারে না—অনাথ শিশু, মানসিক ভারসাম্যহীন, আর প্রয়োজনে, যাদের কণ্ঠ চিরতরে কেড়ে নেওয়া হয়েছে, সেই বয়স্ক মানুষ। বাংলাদেশের হাইকোর্ট ইতিমধ্যে মানসিক ভারসাম্যহীন ও সুরক্ষাপ্রয়োজনী শিশুদের ক্ষেত্রে এই পারেন্স পাত্রিয়ায়ি এখতিয়ার প্রয়োগ করেছেন। যুক্তিটি এখানে অকাট্য। রাষ্ট্র, সরকারি কৌঁসুলি বা সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে, আদালতে দাঁড়িয়ে বলতে পারে, ‘আমি নূর জাহানের হয়ে কথা বলছি। তিনি বেঁচে থাকলে যে অভিযোগ করতেন, আজ আমি সেটাই করছি।’ এটি একটি সৃজনশীল আবেদন, বিপ্লবী চিন্তা, কিন্তু অসম্ভব নয়। আর এ কারণেই নূর জাহানের ঘটনা, যদি সঠিকভাবে লড়া হয়, তবে ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নেবে। এটি একটি নজির হয়ে বাঁচাবে আরও হাজারো নূর জাহানকে।

তবে শুধু একটি আইনের দিকেই তাকিয়ে থাকলে চলবে না। বিচারের আরও দরজা খোলা আছে। দণ্ডবিধির ৩০৪এ ধারা—বেপরোয়া বা অবহেলাজনিত আচরণে মৃত্যু ঘটানো; শাস্তি দুই বছর জেল বা জরিমানা। প্রশ্ন হলো, একজন অসহায় বৃদ্ধা মাকে জেনেশুনে ফেলে রাখা, যখন জানা আছে খাবার নেই, ওষুধ নেই, সেবা দেওয়ার কেউ নেই—এটা কি সেই ‘বেপরোয়া বা অবহেলাজনিত’ আচরণ নয়? চ্যালেঞ্জ আছে, কারণ অবহেলা আর মৃত্যুর মধ্যে সরাসরি যোগসূত্রটা রক্তমাংসের প্রমাণ দিয়ে আদালতে দেখাতে হবে। কিন্তু একটি মাত্র চিত্রই যথেষ্ট—৭৫ বছর বয়সী এক নারী মিরপুরের ফ্ল্যাটে একা মৃত, আর তাঁর যুগ্ম সচিব ছেলে কত দূরে, কত নিরাপদে! ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এখানে মহাভারতের মতো পাণ্ডুলিপি হয়ে উঠবে।

আরও শক্তিশালী অস্ত্র দণ্ডবিধির ৩০৪ ধারা—নরহত্য, যা খুন নয়। যদি প্রমাণ হয় এই সন্তানেরা জানত যে তাদের চরম উদাসীনতা মৃত্যু ডেকে আনতে পারে, আর সেই জেনেও তারা চোখ বন্ধ করে থেকেছে, তবে অভিযোগ গড়াবে নরহত্যায়। শাস্তি দশ বছর পর্যন্ত জেল। এটি প্রমাণ করা খুব কঠিন কিন্তু অসম্ভব নয়। যদি প্রতিবেশী বা আত্মীয়দের ফোন কলের রেকর্ড, বা তাঁদের সাক্ষ্যে বেরিয়ে আসে যে মায়ের অবস্থা বেগতিক জেনেও কেউ এগোয়নি, তাহলে ৩০৪ ধারার সেই নিষ্ঠুর ‘মানসিক উপাদান’টিও প্রমাণ হয়ে যাবে। আরেকটি সমান্তরাল পথ তো চলছেই। আনিসুর রহমানকে বদলির যে খাঁচায় পুরেছে সরকার, সেটা শাস্তি নয়, শুধু সময়ক্ষেপণ। সামনে অপেক্ষা করছে বিভাগীয় মামলা, তদন্ত, এবং যদি অশোভন আচরণ প্রমাণিত হয়, তাহলে চাকরিচ্যুতি। এটা অভিভাবকের অভিযোগের জন্য বসে নেই; এটা নিয়োগকর্তার রোষের বহ্নিমান রূপ।

কিন্তু সবচেয়ে বড় যে আঘাতটা সমাজ ও আইনের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, তা হলো উত্তরাধিকারের নির্মম বাস্তবতা। মুসলিম পারিবারিক আইনে নূর জাহানের সম্পত্তি এখন যাবে কার কাছে? তাঁর সেই তিন সন্তানের কাছে। ছেলে, বুয়েটের শিক্ষক, মেয়ে—তাঁরা মায়ের ফ্ল্যাট, সঞ্চয়পত্র, সবকিছুর ওয়ারিশ হবেন। যে ঘরে মা একা মারা গেলেন, হয়তো সেই ফ্ল্যাটটিও তাঁরা ভোগ করবেন। এটি আইনের এক বিকৃততম কূটাভাস। উত্তরাধিকার আইন কোনো প্রশ্ন করে না—‘তুমি তোমার মায়ের শেষ সময়ে কোথায় ছিলে?’ সে শুধু সম্পর্কের হিসাব জানে, দায়িত্বের মূল্য বোঝে না। ইসলামি আইনে ‘হিরমান’ নীতি বলে হত্যাকারী নিহতের সম্পত্তি পায় না, কিন্তু তা খুনের ক্ষেত্রে। নীরব, নিষ্ক্রিয়, পরিকল্পিত অবহেলায় মৃত্যুর জন্য এই পথ পুরোপুরি খোলা নয়। তবে যদি দণ্ডবিধির ৩০৪ বা ৩০৪এ ধারায় ফৌজদারি শাস্তি আনা যায়, তবেই হয়তো এই উত্তরাধিকারের বেড়াজালে বড় একটা ফুটো করা যাবে। অথবা সংসদ চাইলে পারে পিতামাতার ভরণপোষণ আইনের অধীনে সাজাপ্রাপ্ত সন্তানকে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করার বিধান আনতে। এ লড়াই সংসদের টেবিলেও গড়াবে।

তাহলে এখন পথ কী? সামনে যে রূপরেখা দাঁড় করানো জরুরি, তা এই—পুলিশ এখনই দণ্ডবিধির ৩০৪এ ধারায় মামলা নিয়ে ময়নাতদন্ত, সাক্ষী, ফোনকল ও ব্যাংক রেকর্ডের কঠিন জাল বিছাবে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বদলির এই অস্থায়ী খোঁচা দিয়ে ক্ষান্ত হবে না, আনিসুর রহমানের বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ বিভাগীয় তদন্ত সেরে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেবে। বুয়েট ও স্কুল কর্তৃপক্ষ নৈতিকতার খাতিরে হলেও নিজেদের আচরণবিধির চোখ দিয়ে তাকাবে। আইন কমিশন নির্লিপ্ত থাকতে পারে না; ধারা ৭(২)-এ জরুরি ভিত্তিতে সংশোধন এনে অভিযোগের দরজা খুলে দিতে হবে ভাইবোন, রাষ্ট্র বা স্বপ্রণোদিত ম্যাজিস্ট্রেটের জন্য। আর রাষ্ট্রের আইন মন্ত্রণালয় কি পারে না পারেন্স পাত্রিয়ায়ি-র এই দর্শন নিয়ে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের দ্বারে গিয়ে এক প্রতীকী লড়াই শুরু করতে? এই লড়াই যে কেবল একজন মায়ের জন্য নয়।

নূর জাহান বেগম আর কোনো অভিযোগ করবেন না। ধারা ৭(২) তাঁর জন্য চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু আইন কোনো কবরের ফলক নয়, যেখানে অক্ষরগুলো কালের গর্ভে স্থির। আইন স্রোতস্বিনী নদী, বাস্তবতার পাথরে আছড়ে পড়লে যার গতিপথ বদলায়। মৃত বাদীর কূটাভাস শুধু আমাদের একার নয়, কিন্তু আমাদের জবাবটা হতে হবে একান্ত নিজস্ব। হাইকোর্টের এখতিয়ার আছে, দণ্ডবিধির ধার আছে, সংবিধানের আলো আছে—সবই অস্তিত্বময়, কিন্তু সবই তলাবিহীন কলস, যদি না থাকে রাজনৈতিক ইচ্ছার জল। একটি বদলির আদেশ, একটি টিভি বিবৃতি—এগুলো ছাইচাপা আগুন, ন্যায়বিচার নয়। একটি দণ্ডাদেশ, একটি বিভাগীয় রায়, একটি নতুন নজির—সেটাই হবে আগুন, যা থেকে আলো আসবে। নূর জাহানের মামলা শুধু তিন সন্তানের বিচার নয়; এটি এ দেশের অগণিত বৃদ্ধ বাবা-মায়ের জন্য একটি আহ্বান, যাঁরা নিঃশব্দে ক্ষুধায়, অবহেলায় আর একাকিত্বে ঝরে পড়ছেন। আইন নামের যে ঢাল এঁদের জন্যই তৈরি হয়েছিল, সেটিতে আজ ছিদ্র। আর সেই ছিদ্রটির একটি নাম আছে, একটি চেহারা আছে, একটি নিঃশব্দ চিৎকার আছে—তার নাম নূর জাহান।

লেখক: মোকাররামুছ সাকলান, আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।