সাঈদ আহসান খালিদ
সাঈদ আহসান খালিদ

দ্রুত বিচার বনাম ন্যায়বিচার: রামিসা-আছিয়াদের বিচার কেন অধরা থেকে যায়

সাঈদ আহসান খালিদ : ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের শিকার সাত বছরের শিশু রামিসার বাবা বলেছেন, “আমি বিচার চাই না, কারণ আপনারা বিচার করতে পারবেন না। এটা বড়জোর ১৫ দিন চলবে, আবার কোনো ঘটনা ঘটবে। এরপর এটা ধামাচাপা পড়ে যাবে।” একজন সন্তানহারা পিতার এই উচ্চারণ নিছক শোকের আবেগ নয়; এটি বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার প্রতি একটি গভীর, কাঠামোগত অনাস্থার বহিঃপ্রকাশ। এবং আমি তাঁর সাথে একমত।

২০২৫ সালের ৬ মার্চ মাগুরায় আট বছরের শিশু আছিয়া ধর্ষণের শিকার হয় এবং ১৩ মার্চ ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে মারা যায়। ঘটনাটি সারা দেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করে এবং বিচারিক প্রক্রিয়া নজিরবিহীন গতিতে এগোয়: ৮ মার্চ মামলা, ১৩ এপ্রিল অভিযোগপত্র, ২৩ এপ্রিল বিচার শুরু এবং মাত্র ৭৩তম দিনে মাগুরার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল প্রধান আসামি হিটু শেখকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। এটি সম্ভবত বাংলাদেশের ইতিহাসে এ ধরনের মামলার দ্রুততম বিচার। অথচ এক বছর পেরিয়ে গেলেও সেই দণ্ড কার্যকর হয়নি—মামলাটি এখন উচ্চ আদালতে আপিল পর্যায়ে আটকে আছে।

বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা নিয়ে সবাই ক্ষুব্ধ। কেউ দুষছেন আইন ও বিচারব্যবস্থাকে, কেউ বিচারককে, কেউবা বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রয়োজনীয়তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তাৎক্ষণিক ফাঁসির দাবি জানাচ্ছেন। বিচার কোনো নাটক বা সিনেমা নয়। পপুলিস্ট বা মিডিয়াকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে আইনগত দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রতিস্থাপন করার প্রবণতা গুরুতর গলদ এবং বিপজ্জনক। আইন ও বিচার কোনো একক ব্যক্তির কাজ নয়; এটি একটি সামষ্টিক ও পারস্পরিক নির্ভরশীল প্রক্রিয়া, যেখানে বাদী, বিবাদী, উভয় পক্ষের আইনজীবী, তদন্তকারী পুলিশ, সাক্ষী, মেডিকেল এভিডেন্স প্রদানকারী চিকিৎসক, বিচার প্রশাসন ও স্বয়ং বিচারক জড়িত। বিনি সুতোর মালার মতো এই প্রক্রিয়ায় কোনো একটি পক্ষের অবহেলা বা অতিপ্রতিক্রিয়া পুরো ফলাফলকে খারাপভাবে প্রভাবিত করতে পারে।

আইনের দৃষ্টিতে ‘আলোচিত’, ‘সেনসেশনাল’ বা ‘চাঞ্চল্যকর’ মামলা বলে কোনো শ্রেণি নেই। আইন বিশেষভাবে কোনো অপরাধকে বিশেষ আইনে বিচারের আওতায় না আনলে বিচারপ্রক্রিয়ায় সব মামলাই সমান। নারী ও শিশুর প্রতি সংঘটিত অপরাধের জন্য গঠিত ট্রাইব্যুনালেও দায়েরকৃত সব মামলা আইনের চোখে সমান। ‘চাঞ্চল্যকর’ পরিভাষাটি মূলত মিডিয়া ট্রায়ালের সৃষ্টি, আইনের নয়।

মিডিয়া ট্রায়ালে সবাই অংশ নিতে পারলেও বিচারক আত্মপক্ষ সমর্থনে অংশ নিতে পারেন না। ফলে জুডিশিয়াল ট্রায়ালকে মিডিয়া ট্রায়ালের কাঠগড়ায় তুললে পপুলিস্ট দৃষ্টিভঙ্গি হয়তো শক্তিশালী হয় এবং ‘জনতার জয়’ হয়, কিন্তু চূড়ান্ত বিচারে বিচারব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ন্যায়বিচার পরাহত হয়। আইন ও বিচার সংস্কারের দাবি অবশ্যই উঠুক—কিন্তু বিচার কোনো ক্যাপসুল নয় যে এক গ্লাস পানিতে গিলে নিলে কয়েক ঘণ্টায় রোগ সারবে।

তাৎক্ষণিক বিচারের দাবি বোঝার জন্য মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধের প্রকৃত পদ্ধতিগত স্তরগুলো বোঝা জরুরি। প্রথমত, তদন্ত ও বিচার। দ্বিতীয়ত, মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য মামলাটি ফৌজদারি কার্যবিধির বিধান অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয়ভাবে হাইকোর্ট বিভাগে ডেথ রেফারেন্স হিসেবে যায়, যেখানে দণ্ড বহাল, হ্রাস বা বাতিল হতে পারে। তৃতীয়ত, হাইকোর্ট দণ্ড বহাল রাখলে দণ্ডিত ব্যক্তির আপিল বিভাগে আপিলের সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে। চতুর্থত, আপিল বিভাগের রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ আবেদন করা যায়; রিভিউ গৃহীত হলে মামলাটি কার্যত নতুন করে শুনানির প্রয়োজন হয়। এর পরও রয়েছে সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদের অধীনে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন।

এই স্তরগুলোর প্রতিটিতে যে বিলম্ব ঘটে, তা কোনো অনুমান নয়; এটি ফ্যাক্ট। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেথ পেনাল্টি রিসার্চ ইউনিটের গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় অর্ধেক মৃত্যুদণ্ডের মামলায় দায়েরের পর হাইকোর্ট বিভাগে নিষ্পত্তি হতে দশ বছরের বেশি সময় লেগেছে; গড়ে বিচারিক আদালতে প্রায় সাড়ে চার বছর এবং তারপর হাইকোর্ট বিভাগে আরও প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর। একটি ডেথ রেফারেন্স নিষ্পত্তিতে সাধারণত পাঁচ থেকে সাত বছর এবং পরবর্তী আপিল-রিভিউ পর্যায়ে আরও পাঁচ থেকে দশ বছর লেগে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। ফলে বিচারিক পর্বে কেউ সাত দিনে দোষী সাব্যস্ত হয়ে মৃত্যুদণ্ড পেলেও স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সেই দণ্ড কার্যকর হতে অন্তত পনেরো বছর লেগে যেতে পারে।

আছিয়ার মামলা এই বাস্তবতার নিখুঁত উদাহরণ। বিচারিক পর্বটি যত দ্রুতই হোক, পরবর্তী স্তরগুলোতে এসে প্রক্রিয়া থমকে গেছে। মনে রাখতে হবে, কেবল একটি বিচ্ছিন্ন মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি ন্যায়বিচারের প্রতিশব্দ নয়। রাষ্ট্রপক্ষ অতি তাড়াহুড়োয় এগোলে তদন্ত বা বিচারে গুরুতর ত্রুটি ঘটতে পারে, যার সুবিধা আপিল পর্যায়ে অভিযুক্ত পান এবং শেষ পর্যন্ত খালাস বা দণ্ড হ্রাস ঘটতে পারে। অর্থাৎ প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা শক্তিশালী না করে কেবল আলোচিত মামলায় অস্বাভাবিক গতি দেখানো শেষ বিচারে ন্যায়বিচারকেই ব্যাহত করতে পারে।

ন্যায়বিচারের ভিত্তি স্থাপিত হয় তদন্তে। ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ অনুযায়ী ফৌজদারি মামলা তদন্তের এখতিয়ার ন্যস্ত পুলিশের হাতে—যা একটি ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার। থানা পুলিশকে একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, প্রটোকল ডিউটিসহ নানা কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়, পাশাপাশি থাকে রাজনৈতিক প্রভাব ও চাপ। ফলে দ্রুত, সুষ্ঠু, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত অনেক ক্ষেত্রে অসম্ভব হয়ে পড়ে; তদন্তে বিলম্ব ঘটে, দায়সারা ও ত্রুটিপূর্ণ প্রতিবেদন দাখিল হয়, অপরাধীরা ফাঁকফোকর গলে খালাস পেয়ে যায়। আইনের বিধান নিয়ে অস্পষ্টতায় ভুল বা অপ্রযোজ্য ধারায় মামলা দায়েরের ঘটনাও মামলার মেরিট নষ্ট করে এবং পুলিশ-আদালতের মূল্যবান সময় ব্যয় করে।

স্বতন্ত্র তদন্ত সংস্থা যে অবাস্তব নয়, তার প্রমাণ দেশে-বিদেশে আছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই) দুই শতাধিক শ্রেণির ফেডারেল অপরাধ তদন্তের এখতিয়ারসম্পন্ন। বাংলাদেশেও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নিজস্ব তদন্ত সংস্থা রয়েছে। আইন কমিশনের ম্যান্ডেটেই “ফৌজদারি মামলার তদন্তের জন্য একটি পৃথক তদন্ত সংস্থা প্রতিষ্ঠা”র সুপারিশ করার দায়িত্ব অন্তর্ভুক্ত। সাম্প্রতিক ও সুনির্দিষ্ট সুপারিশটি এসেছে অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন থেকে, যারা ২০২৫ সালের শুরুতে প্রধান উপদেষ্টার কাছে দাখিল করা প্রতিবেদনে পুলিশ থেকে পৃথক, নিজস্ব নিয়োগ-প্রক্রিয়া ও বাজেটসম্পন্ন একটি ‘স্বাধীন ফৌজদারি তদন্ত সার্ভিস’ গঠনের জোরালো সুপারিশ করেছে। কমিশনের পর্যবেক্ষণ ছিল—দুর্বল তদন্তই নিম্ন দণ্ডহারের অন্যতম প্রধান কারণ। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে দক্ষ ও মেধাবী আইনের স্নাতকদের তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ করা গেলে তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে—এটি যুক্তিসংগত প্রত্যাশা। কিন্তু সুপারিশ বাস্তবায়নের রাজনৈতিক ইচ্ছাই যে অনুপস্থিত।

তদন্ত-পরবর্তী বিচারপ্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনা করেন সরকারি আইন কর্মকর্তারা। সংবিধানের ৬৪ অনুচ্ছেদ ও Bangladesh Law Officers Order, 1972 অনুযায়ী সর্বোচ্চ আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনা করেন অ্যাটর্নি জেনারেল, অতিরিক্ত, ডেপুটি ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলরা; আর ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ৪৯২ ধারা অনুযায়ী অধস্তন আদালতে নিয়োগ পান পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি), সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) ও সরকারি কৌঁসুলি (জিপি)।

এই কাঠামোর সমস্যা একাধিক। নিয়োগে কোনো নির্দিষ্ট যোগ্যতার মানদণ্ড নেই; প্রতিযোগিতামূলক মেধা পরীক্ষার বদলে রাজনৈতিক আনুগত্যই বহু ক্ষেত্রে নিয়োগের মুখ্য বিবেচ্য। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে নিয়োগ বাতিল হয়; নবনিযুক্ত কর্মকর্তারা পুরোনো মামলায় আগ্রহী হন না, ফলে মামলার জট বাড়ে ও বিচার বিলম্বিত হয়। অনেক মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের পরাজয়ের পেছনে কিছু আইন কর্মকর্তার অদক্ষতা, অসহযোগিতা ও দুর্নীতি মুখ্য ভূমিকা রাখে; অথচ রাষ্ট্রীয় অর্থে সম্মানি দেওয়া হলেও দায়িত্ব অবহেলার জন্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নেই।

বিশ্বের অধিকাংশ দেশে এর বিকল্প রয়েছে। শ্রীলঙ্কায় অ্যাটর্নি জেনারেলের বিভাগে পেশাদার ও স্থায়ী ‘স্টেট কাউন্সেল’ সার্ভিস বিদ্যমান, যেখানে নিয়োগ হয় কাঠামোবদ্ধ প্রক্রিয়ায়; জাপানে রয়েছে পেশাদার ক্যারিয়ার-প্রসিকিউটর ব্যবস্থা। ফলে রাষ্ট্রের প্রধান কয়েকজন আইন কর্মকর্তা সরাসরি নিয়োগ পেলেও বাকিরা প্রতিযোগিতামূলক ও স্থায়ী প্রসিকিউশন সার্ভিসের অংশ। বাংলাদেশেও এই সংস্কারের সুনির্দিষ্ট ইতিহাস আছে এবং তা ব্যর্থ হওয়ার ইতিহাসও। ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার একটি স্থায়ী সরকারি অ্যাটর্নি সার্ভিস অধ্যাদেশ প্রণয়ন করেছিল কিন্তু ২০০৯ সালে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এসে অধ্যাদেশটিকে আইনে পরিণত করেনি, ফলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকারিতা হারায়। এক যুগেরও বেশি পরে, ২০২৫ সালে বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন আবার অ্যাটর্নি জেনারেলের অধীনে দুটি শাখায়—সুপ্রিম কোর্ট অ্যাটর্নি সার্ভিস ও জেলা অ্যাটর্নি সার্ভিস নামে মেধাভিত্তিক নিয়োগের ‘স্থায়ী সরকারি অ্যাটর্নি সার্ভিস’ গঠনের সুপারিশ করেছিল। কিন্তু সেটিও আলোর মুখ দেখার কোনো আশা করা যাচ্ছে না। আবারও রাজনৈতিক সদিচ্ছার স্তরে আটকে যাচ্ছে। আদালতে রাজনৈতিক আধিপত্য বজায় রাখার তাগিদই যে এই সংস্কার আটকে থাকার মূল কারণ, তা অনুমান করা কঠিন নয়।

২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার ছিল সংস্কারের সূচনাকারী; ১৮ মাসে এটি ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করে, যার মধ্যে বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতা-সংশ্লিষ্ট একাধিক যুগান্তকারী অধ্যাদেশ ছিল। অন্যদিকে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির ভূমিধস বিজয়ের পর গঠিত নির্বাচিত সরকার এখন সেই সংস্কারগুলো হয় প্রত্যাখ্যান না হয় দুর্বল করছে—এমন অভিযোগের প্রমাণ স্পষ্ট।

প্রথমত, ৯ এপ্রিল ২০২৬-এ জাতীয় সংসদ “সুপ্রিম কোর্ট বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, ২০২৫” রহিত করে, যা প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে একটি স্বাধীন ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল’ গঠন করে উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগে নির্বাহী প্রভাব হ্রাস করেছিল। দ্বিতীয়ত, একই দিনে “সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫” রহিত করা হয়। এর ফলে সদ্য গঠিত সুপ্রিম কোর্টের স্বতন্ত্র সচিবালয়টি বিলুপ্ত হয় এবং অধস্তন আদালতের বিচারকদের পদায়ন, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলার নিয়ন্ত্রণ পুনরায় সরকারের আইন ও বিচার বিভাগের অধীনে চলে গেছে। তৃতীয়ত, “জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ” রহিত করে ২০০৯ সালের তুলনামূলক দুর্বল আইনটি পুনর্বহাল করা হয়েছে।

সংসদের এই পদক্ষেপের সমান্তরালে নির্বাহী বিভাগ আদালতেও একই অবস্থান নিয়েছে। সম্প্রতি হাইকোর্ট বিভাগ এক পূর্ণাঙ্গ রায়ে অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা-সংক্রান্ত সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের সংশোধনী অসাংবিধানিক ঘোষণা করে ১৯৭২ সালের ১১৬ অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল করেছে এবং তিন মাসের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষ গতকাল সেই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছে। ফলে নির্বাহী বিভাগ আইনসভা ও বিচার বিভাগ—উভয় ক্ষেত্রেই অধস্তন আদালতের ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার চেষ্টা করছে—এটি দৃশ্যমান।

চতুর্থত, পুলিশ সংস্কারের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা। অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫ এমনিতেই দুর্বল ছিল—কমিশনকে পুলিশ পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষের বদলে মূলত সুপারিশকেন্দ্রিক করা হয়েছিল। এখন এটিকে সংশোধিত আকারে বিল হিসেবে উপস্থাপনের প্রক্রিয়ায় এমনকি আইজিপি নিয়োগে কমিশনের সুপারিশের ১২ ধারার ক্ষমতাটুকুও বাদ পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অধ্যাদেশ জারির সময়ই ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) একে “গণ-আকাঙ্ক্ষার প্রতি উপহাস, অর্থহীন ও আত্মঘাতী” বলে আখ্যায়িত করেছিল।

পুলিশ, তদন্ত, প্রসিকিউশন ও বিচার বিভাগ—চারটি ক্ষেত্রেই একটি অভিন্ন প্যাটার্ন দৃশ্যমান: সংস্কারের আইনি পদক্ষেপ এবং পৌনঃপুনিক সুপারিশ সত্ত্বেও এটির বাস্তবায়ন বারবার রাজনৈতিক স্তরে আটকে গেছে বা বিপরীত দিকে গেছে। তাৎপর্যপূর্ণ হলো, এটি কোনো একক সরকারের সমস্যা নয়—২০০৯ সালের আওয়ামী আমল হতে ২০২৬ সালের বর্তমান নির্বাচিত সরকার, উভয়েই নির্বাহীর হাতে বিচার ও আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার একই কাঠামোগত প্রণোদনায় পরিচালিত হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়।

স্বাধীন পুলিশ, স্বাধীন তদন্ত সংস্থা, স্বাধীন প্রসিকিউশন ও স্বাধীন বিচার বিভাগ—এই চার স্বাধীনতা ন্যায়বিচার ও দ্রুত বিচারের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত আবশ্যকীয় শর্ত। এগুলো নিশ্চিত করতে প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, উপযুক্ত আইনি কাঠামো, জনবল ও অবকাঠামো। কিন্তু জুলাই সনদে সব দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে দেওয়া প্রতিশ্রুতির বিপরীতে আমরা দেখছি উল্টো যাত্রা—সংশ্লিষ্ট পদক্ষেপগুলো হয় বাতিল, নয়তো নিষ্ক্রিয়, অথবা ‘পরবর্তী বিবেচনা’র হিমাগারে।

রামিসার বাবার বক্তব্যের কাছে ফিরে আসি। বিচার না পাওয়ার তাঁর যে শঙ্কা—সেটি কোনো বিচ্ছিন্ন আবেগ নয়—এটি একটি কাঠামোগত ব্যর্থতার পূর্বাভাস, যা আছিয়া বা অন্যান্য শিশু ধর্ষণ মামলার বিচার প্রক্রিয়ায় ইতিমধ্যে সত্য প্রমাণিত। একটি বিচ্ছিন্ন মামলার দ্রুত রায় ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা দেয় না। তদন্ত থেকে চূড়ান্ত দণ্ড কার্যকর পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি যদি ইচ্ছেকৃত দুর্বল ও রাজনৈতিক স্বার্থ প্রণোদিত থাকে, তবে যত আলোচিত মামলাতেই অস্বাভাবিক গতি দেখানো হোক, ন্যায়বিচার অধরাই থেকে যাবে।

তাই রামিসা কিংবা আছিয়ার জন্য প্রকৃত ও টেকসই বিচার নিশ্চিত করার একমাত্র পথ উপরোক্ত চারটি প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার বাস্তবায়ন—আর তার পূর্বশর্ত হলো সেই রাজনৈতিক সদিচ্ছা, যার ঘাটতি আজ বাতিল ও স্থগিত হওয়া আইনি কাঠামোর তালিকাতেই স্পষ্ট হয়ে আছে।

লেখক: শিক্ষক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।